লোড বন্ধ করুন
  • আজঃ রবিবার, ১০ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৩শে জানুয়ারি, ২০২২ ইং

পীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে মেশিন হয়ে দুনিয়ায় এসেছি – ফয়সাল ফারাবী

পরিবেশটা কেমন ভারি হয়ে উঠেছে না! কান্নার শব্দ, হায়-হুতাশ, এম্বুলেন্স এর হুইসেল, পুলিশের বাশির শব্দ, আর এই হতভাগা পোড়া রোগিদের আর্তচিৎকার, আর্তনাদ! শুনছেন?
।।।।।।।।

দ্য মোস্ট ইন্টারেস্টিং ফ্যাক্ট হচ্ছে এটাই যে,
আপনি ভুল বলছেন, ভুল বলছেন বলে চিৎকার চেঁচামেচি করে আপনারা যে সময় নষ্ট করেন, সেই সময়ের মধ্যে কিন্তু সঠিক কথাটা বলে ফেলা যায়। অথচ দুঃখজনক হল যে সঠিক কথা বলা থেকে অন্য কে ভুল বলেছে সেটা নিয়েই আপনারা বেশি তৎপর।

যদি কারো ভুল চোখে পড়ে তাহলে সঠিক কী সেটা উল্লেখ করেন। তাতে একই সাথে কাজ দুটো হয়। ১.ভুল মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে না। ২.সঠিক বিষয় আলোচনায় এসে ভুলকে স্থানচ্যুত করে দেয়।

সহজ পথ থাকতে মানুষ অকারণ কেন জটিল হইতে চায়?
মৃদূ বিরক্তি মাখা কথাগুলো আমার কন্ঠে কিছুটা উচ্চস্বরে শুনে আমাকে উদ্দেশ্য করে সিআইডির সাব ইন্সপেক্টর বললেন, দেখেন! আমার কিছু দায়িত্ব আছে। আমি আমার দায়িত্ব পালনে বদ্ধপরিকর। তাছাড়া এমন একটা কেইস এ তো সেটা আরো বেশি অগ্রগণ্য। আমি কোনো মতেই আমার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারি না।

সিআইডির চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললাম, ঠিক বলেছেন। এরকম চিন্তা সবারই করা উচিত। আপনার জায়গায় আমি হলে আমাকেও ঠিক এমন চিন্তা করতে হতো। কিন্তু হুট করে নয়, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আমি আমার ট্রিটমেন্ট এর গুরুত্ব বিবেচনায় কাউকেই এলাও করতে পারি না। আপনাদের টিম তো কাজ করছেই।এটেন্ডেন্ট পরে আসুক! এটেন্ডেন্ট একবার ঢোকা শুরু করলে সাধারণ মানুষও ভিতরে প্রবেশ করতে চাইবে। বাইরে হাজারো মানুষের ভিড়। আমাদের পক্ষে তখন পূণরায় ট্রিটমেন্ট বান্ধব পরিবেশ ফিরে পেতে কষ্ট হয়ে যাবে।

মা

মানুষ বড়ই উৎসুক জীব। তারা মূল বিষয়বস্তুকে ততটা গুরুত্ব দেয় না যতটা গুরুত্ব তারা শোনা কথায় বা ফাঁকা জায়গায় হুট করে গড়ে ওঠা জনসমাগমকে দেয়।

এটা এখন একটা জাতীয় ইস্যু। একাধিক মানুষ পুড়ে দগ্ধ হয়েছে এই অগ্নিকাণ্ডে। গণমাধ্যমের প্রায় সব চ্যানেল এখানে। সারা দুনিয়ায় মানুষ লাইভ দেখছে। কাছাকাছি অবস্থান রত প্রায় সবার গন্তব্য এদিকে।
সরি, আমি কাউকেই এলাও করছি না।

লক্ষ্য করলাম, সাব ইন্সপেক্টর কিছুটা শান্ত হলেন। তাই বলে কাউকেই পারমিশন দেবেন না।
বললাম, নিশ্চয়ই! শুধুমাত্র মা’কে।

সাব ইন্সপেক্টর কিছুটা শান্ত হয়ে এলেন। বললেন, চিনবেন কিভাবে? কে মা, কে মা নয়!!
বললাম, পরিবেশটা কেমন ভারি হয়ে উঠেছে না! কান্নার শব্দ, হায়-হুতাশ, এম্বুলেন্স এর হুইসেল, পুলিশের বাশির শব্দ, আর এই হতভাগা পোড়া রোগিদের আর্তচিৎকার, আর্তনাদ! শুনছেন?
হ্যাঁ। সৃষ্টিকর্তা সহায় হোন।
আমিন।

মা যখন আসবে, এই একশ কোটি মুখের আওয়াজ আপনার কানে আর পৌঁছবে না তখন। সন্তানের এহেন পরিণতির কথা মা যখন জেনেছে তখন বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডের সমস্ত প্ল্যানেট, নক্ষত্র সব একসাথে মায়ের বুকের ভিতর উল্কার মতো তীব্র গতিতে আঘাত হেনেছে। সে বিশাল জ্বালা মায়ের কন্ঠ রোধ করেছে। পোড়া, ঝলসানো, ভয়ংকর এই সন্তানের মুখ দেখতেই তা গগন ফাটা আওয়াজ হয়ে বের হবে মায়ের কন্ঠ দিয়ে। সে আওয়াজ সৃষ্টিকর্তার আরশে গিয়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরবে।

সন্তান কাতরানোর বেদনায়, যাতনায় মায়ের পরান দগ্ধ হবে। চোখ দিয়ে তার কালগ্রাসী তাপ বের হবে। সে তাপে সমস্ত ভূখণ্ডের যত যত মরুভূমি, সব পুড়ে ভষ্ম হয়ে যাবে।

গল্পটা বেশিদিন আগের নয়। ১২ ডিসেম্বর ২০১৯। আমি তখন সেকেন্ড ইয়ার এর স্টুডেন্ট। ক্লিনিক্যাল প্র‍্যাক্টিস করছি ঢাকা মেডিকেলে। কেরানীগঞ্জ এর কোনো এক প্লাস্টিক ফ্যাক্টরিতে আগুণ লেগেছিলো। বিভীষিকাময় সেই রাতের কথা বলতে চাইছি আজ। না। সেই রাতের কথা না। সেই মায়ের কথা। সেই মায়েদের কথা।

বার্ণ ইউনিটেরএইসডিইউ এর ১২ নাম্বার বেডের ছেলেটা। ১৯ বছর কি ২০ বছর বয়সের। নামটা মনে নেই। কতজনের নাম মনে রাখবো?
যাই হোক,

নাইন্টি পার্সেন্ট বার্ণ। এই ছোট্ট কিশোর তার জীবনের সমস্ত প্রয়োজন মাত্র ২০ বছর বয়সেই মিটিয়ে নিয়েছে। এখন শুধু অন্তিম যাত্রার অপেক্ষা।
প্লাজমা(রক্তরস) দেয়ার জন্য তার শরীর থেকে এতটুকু রক্ত লাগবে। ব্লাড গ্রুপিং ও ক্রস ম্যাচিং করার জন্য যেটা অপরিহার্য। এপার ওপার মিলনায়তনে তার অবস্থান। মৃত্যু যন্ত্রণা কতটা কষ্টের! সেদিন যদি এই স্বপ্নচারী বালকের মুখের আওয়াজ শুনতেন তবে যুগ যুগান্তর তা আপনার শরীরে মনে আতঙ্ক হয়ে বাসা বাধতো।

ফেমোরাল ভেইন থেকে ব্লাড নিবো প্ল্যান করে ছেলেটিকে বললাম, বাবা! তোমার উরুর উপর থেকে রক্ত নিবো। এবং হাতের স্পর্শ দিয়ে রক্ত নেয়ার জায়গাটা তাকে নিশ্চিত করলাম। একটু ব্যাথা পাবা। কারন সমস্ত শরীর পুড়ে যাওয়ায় তার চোখ দুটো পুরোপুরি ভাবে বন্ধ হয়ে গেছিলো। ২০০ পাওয়ার এর এনার্জি লাইট তার কাছে আমাকে দেখতে সাহায্য করেনি। অন্ধকারে হাতড়াতে লাগলো। বুঝলাম সে আমার হাত ধরতে চায়।
আগুণে তার ল্যারিংক্স, ফ্যারিংক্স সবই পুড়ে গিয়েছিলো। যে কারণে তার কন্ঠ ভাঙা শোনাচ্ছিল।

স্যার! ও স্যার!! একটু শোনেন!!!!! কাছে গিয়ে হাতে হাত দিলাম। আমার হাতে তার ঝলসানো মাংস লেগে গেলো। বিভৎস রকমের পোড়া গন্ধ চারিদিকে।
বললাম, বলো ভাই!!!!!!!!!!!!!!!! যা যা মনে আছে সবই বলো। আমি সবই শুনবো। বলো ভাই!! আমার কান্না পাচ্ছিলো। আমার বুকের মধ্যে একটা বড়সড় পাথর পড়ুক এটাই চাইছি আমি তখন। সেই পাথর আমার বুকে চেপে থাকা সমস্ত কান্নাকে গলা টিপে ধরুক। কিসের কান্না!!

আমি কান্না করলে হবে কেনো? আমি তো একটা মেশিন। আমার তো কাজ আছে। আমি পীড়িত মানুষের জীবন বাঁচাতে মেশিন হয়ে এই দুনিয়ায় এসেছি। প্রত্যেকটি কাজ আমার জন্য গন্ডির মধ্যে থাকবে। ভিন্ন ভিন্ন গন্ডিতে আমার ভিন্ন ভিন্ন পারফরম্যান্স। এখানে আমি কান্না করবো না।

ছেলেটা বললো, আমার সারা শরীরে কোনো ব্যাথা নেই। শুধু বুকের ঠিক মধ্যখানে একটা অসহ্য ব্যাথা। মনে হয় পাকা কোনো তীরন্দাজ তীর মেরেছে।
পেশেন্ট এর কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সিম্পটম মনে করে আমি হাত ছাড়িয়ে ডক্টর কল করতে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। তখন আমি স্টুডেন্ট। তাই সিম্পটম একটা আরেকটার সাথে মিলিয়ে ফেলি।

ছেলেটি বললো, মা। মা। মা……… শুধু একবার তার মুখ দেখবো। ব্যাস……. ব্যাথা শেষ…. আর আমিও…..!!!!!
তার দুচোখ পুড়ে গেছিলো। শুধুমাত্র কল্পনায় এঁকে দেখা সম্ভব মাকে। বাস্তবে আর কখনো নয়। তবুও যদি প্রাণে বেঁচে থাকে তবে। যদিও সাধ্যের চেয়ে এটা অনেক বেশি চাওয়া।

মা……………………….মা…………………মা…………….
পিছনের বেড থেকে কান্নার আওয়াজ পেলাম। আহ….! আরেকজন মারা গেলো। সিআইডি এসে বললেন, ১১।
চলবে…..