• আজঃ রবিবার, ২রা কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৭ই অক্টোবর, ২০২১ ইং

অতঃপর একজন মাতৃকুকুর এবং আমি – ফয়সাল ফারাবি

স্নায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, মস্তিষ্কে বিভিন্ন সংবেদী অঙ্গের পাঠানো ইনপুট কে বিশ্লেষণ করে সেটি কতটা মূল্যবান তা যাচাই করে সংরক্ষণ করার জন্য সিদ্ধান্ত নেয় হিপ্পোক্যাম্পাস এবং ফ্রন্টাল কর্টেক্স মিলে । যদি তাদের বিশ্লেষণে সেটি মূল্যবান মনে হয় তাহলে সেটাকে মস্তিষ্কে দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি বা long-term memory হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়।

স্নায়ুতন্ত্র থেকে নিউরণের সাহায্যেই আমাদের কোনো বস্তু বা বিষয় সম্পর্কিত ধারণা যা আমরা মনে রাখতে চাই তা সংকেত আকারে মস্তিষ্কে যায় এবং সংরক্ষিত থাকে । বেনারসি পল্লীতে যে কাজে গেছিলাম সেটা মনে রাখার মতো বিশেষ প্রয়োজন মনে করিনি তখন। তাই আমার মস্তিষ্কও তা সংরক্ষণ করেনি। মনে না করতে পারার কারণ মূলত এটাই। কেউ হয়তো আমাকে ভূলোমনা বা ক্ষীন স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন মনে করতে পারেন। তাই আগেই খুলে বললাম বেপারটা।

যাইহোক, বেনারসি পল্লী থেকে ফিরছিলাম সেদিন। বেনারসি কেনার জন্য না, অন্য কি যেনো একটা কাজে গেছিলাম সেখানে। কিন্তু মনে করতে পারলাম না ঠিক কোন কাজের জন্য গেছিলাম।

ঘটনা টা ১৭ সালের নভেম্বর বা ডিসেম্বরের দিকের হবে। আমি বেনারসি পল্লী থেকে বাসায় ফিরছি। ক্যাম্পাস থেকে সোজাসাপটা চলে গেছিলাম সেখানে। কাধে তাই ব্যাগ। ক্লাস ক্যাপ্টেন হওয়ার সুবাদে প্রতিটা ক্লাসের শীট এবং দরকারী সব কাগজপত্র আমার ব্যাগে রাখতে হতো সবসময়। ব্যাগটা তাই বেশ বড়সড় দেখাতো।
বন্ধুরা বলতো ব্যাগটা দেখতে আট মাসের প্রেগন্যান্ট মেয়েদের মতো।

পরণে সাদা প্যান্ট আর সাদা শার্ট, পায়ে সাদা জুতা। ড্রেসকোডের বাইরের কোনো রঙের পোষাক পরে ক্লাস করার নিয়ম নেই। এখন অবশ্য সাদাকে বিশ্রামে রাখা হয়েছে। জলপাই রং এখন শোভা পায় আমার শরীরে।
যাই হোক, মূল বিষয়বস্তুতে আসি। বাসার কাছাকাছি চলে এসেছি প্রায়। ৫ মিনিট পর বাসা।

ব্যাগের ভারে কুজো হয়ে হাটছি। ঘড়ির দিকে তাকালাম। পাঁচটা বেজে সতেরো মিনিট। শিতের দিন। এখনই তাই সূর্যমামা ঘুমাতে যাওয়ার বন্দোবস্ত করছে। আমার বেশ ক্ষুধা পেয়েছে। বাসায় আজ কি রান্না হয়েছে? নিশ্চয়ই গরুর কলিজা। ফ্রিজ থেকে বের করে পানিতে ভিজিয়ে রেখেছিলেন আন্টি। সকালে দেখে এসেছি।

হঠাৎ ভাবনায় ছেদ পড়লো। একটা কুকুর। দূর থেকে লক্ষ করলাম, কুকুরটা প্রচন্ডভাবে ছটফট করছে। শরীরে গরম তেল লাগলে যেভাবে ছটফট করার কথা ঠিক তেমনভাবে। ছোটবেলায় একটা কুকুরের শরীরে গরম তেল ফেলেছিলাম কয়েক ফোটা, ভুল করে। খারাপ লেগেছিলো অনেক। না দেখেই ফেলেছিলাম।

আমাদের হোটেলের পরোটা ভাজার যে বড়ো তাওয়া (চ্যাপ্টা কড়াই বিশেষ) ছিলো তা থেকে।
কি হয়েছে! কুকুরটার দিকে তাকিয়েই একটু জোর পায়ে হাটা শুরু করলাম। ম্যানহোলের দুইটা ঢাকনা সরানো। হয়তো পরিষ্কার করার জন্য পরিচ্ছন্ন কর্মীরা সরিয়েছে। বা অন্য কেউ। অন্য কোনো কাজে।
যাই হোক সেটা মূখ্য বিষয় না।

কুকুরটা এমন কেনো করছে? আলগা ম্যানহোলটার চারদিকে কয়েকবার করে ঘুরপাক খাচ্ছে, আর ড্রেন এর ভিতরে অবাক হয়ে তাকাচ্ছে। আবার থামছে। সামনের পা দুটো ভাজ করে নিচের দিকে উঁকি দিচ্ছে। বা নামার চেষ্টা করছে। কোনো কারনে নামতে পারছে না। আবার সোজা হয়ে দাড়াচ্ছে। দৌড়ে রাস্তা পার হচ্ছে। আবার ছুটে যাচ্ছে ম্যানহোলের কাছে। আবার দৌড়ে যাচ্ছে রাস্তার ওপাশে। আবার আসছে। কাকে যেনো খুজছে। কাকে খুজছে?

কাছে যেতেই কুকুরটা প্রচন্ড বেগে ছুটে এসে আমার পায়ের কাছে বসে পড়লো। ভয়ে শরীর শিউরে উঠলো আমার। কামড়াবে নাকি? স্থির হয়ে দাড়িয়ে রইলাম কয়েক সেকেন্ড। বা মিনিট খানেক। সাধারণত মানুষের মত স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে ভয় পেলে শরীরের লোম দাড়িয়ে যায়।

আমরা যখন ঠাণ্ডার মধ্যে থাকি, তখন আমাদের বাঁচাতে ত্বক নিজে থেকেই শরীরের উপর একটি আবরণ তৈরি করে নেয়, যেটাকে আমরা বলি শরীরের লোম দাড়িয়ে গেছে। আমরা যখন ভয় পাই, তখন শরীরে হরমোনের উত্তেজনা দেখা দেয়। ফলে আমাদের ত্বকে এরকম একটা আবরণ তৈরি হয়। সুপ্রারেনাল গ্ল্যান্ড এটার দায়িত্বে আছে।

কুকুরটা উঠে দাড়িয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে লেজ নাড়াতে লাগলো। আর মুখ দিয়ে অদ্ভুত এক শব্দ করতে লাগলো। আউ……..উ…… এই রকমের। কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। ভয় কেটে গেছে অবশ্য এতক্ষণে। আচরণ দেখে বুঝলাম সে আমাকে কামড়াবে না। কুকুরটা আবার দৌড়ে গেলো ম্যানহোলটার দিকে। সে যে নিশ্চয় কোনো একটা বিপদে পড়েছে আঁচ করতে পারলাম তখন।

এগিয়ে গেলাম।
অবাক হয়ে দেখলাম একটা বাচ্চা কুকুর ম্যানহোলের পচা পানির মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওয়াল বেয়ে উপরে ওঠার জন্য সামনের দু পা দিয়ে ম্যানহোলের ওয়ালে আঁচড় দিচ্ছে। শীতে কাপছে বাচ্চাটি। বাচ্চাটিকে তুলতে হবে চিন্তা করলাম। কিন্তু অবাক হলাম বেশ। কত মানুষই তো চলাচল করে এদিকে। কারো চোখেই কি পড়েনি?

তাছাড়া ঠিক দুহাত দুরেই একটা মুদিখানার দোকান। একটা বুড়ো কাকা দোকানের মালিক। বসে বসে খাতায় কি জানি লিখছে। দূটো ছোট ছেলে দোকানের ভিতরে বসে আছে । কোনো ক্রেতা নেই দোকানে। ছেলে দুটো মনে হয় দোকানে কাজ করে। তা না হলে দোকানের ভিতরে বসে থাকবে কেনো? দোকানদার কাকা তো এই দুটো ছেলের একজনকে দিয়ে বাচ্চাটা উঠিয়ে দিতে পারতেন। মনে মনে ভাবলাম।

না মানুষ কি করলো বা কি করবে এটা আমার ভাবনার বিষয়বস্তু হতে পারে না। আম্মু আমাকে এটা শিখিয়েছিলেন। কথাটা মনে পড়তেই আমি ম্যানহোলে নামার জন্য প্রস্তুতি শুরু করলাম।
ব্যাগটা রাস্তার উপর রেখে প্যান্টটা নিচের দিক থেকে দুইটা ভাজ দিলাম। জুতাটা খুলে ম্যানহোলে নেমে গেলাম। গভীরতা ছয় ফিট হবে। আমার ছড়া দুই ইঞ্চি বেশি আর কি। ম্যানহোলে নামতেই প্রচন্ড বাজে গন্ধ নাকে আসতে লাগলো।

পচা পানির ধীরগতির স্রোত। বাচ্চাটা স্রোতের বিপরীতে আমার দিকে আসতে চাইলো। দু তিনবার ব্যার্থ হয়ে পরে আস্তে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগলো। মুখে একটা শব্দ করতে করতে আমার দিকে এগিয়ে এলো। ওর মা প্রথম আমাকে দেখে যেমন শব্দ করেছিলো, সেরকম।

উপরে ছয় সাত জন লোক জোগাড় হয়ে গেলো। আমাকে বিভিন্ন প্রকার দিক নির্দেশনা দিতে লাগলো তারা। আমি কারো কথা কানে নিচ্ছিলাম না। পরামর্শগুলো আমার কাছে বেশ বিরক্তিকর মনে হতে লাগলো।
তারা তো পারতো বাচ্চাটাকে উঠাতে। ওঠায়নি। একজন বলে উঠলো “সেই দুপুরে দেখে গেছি বাচ্চাটা পড়ে আছে , এখনো কেউ উঠায়নি? হায়রে মানুষ! ” আমি লোকটার দিকে একবার তাকালাম। মুরব্বি লোক। নাক মুখ চেপে রেখে দুর থেকে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করে আছে লোকটা। পাছে ড্রেনে পড়ে যায়!

যদি দুপুরে পড়ে গিয়ে থাকে তাহলে অনেকেই দেখেছে বাচ্চাটাকে। তাছড়া মা কুকুরটিও বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছে সবাইকে। আমাকে বোঝাতে পেরেছে। তারমানে অনকের কাছেই সে গিয়েছিলো(মা কুকুর)। সবাই হয়তো বিরক্ত হয়ে দুইটা লাথি মেরে চলে গেছে। বা ভয় পেয়ে দৌড়ে পালিয়েছে অনেকেই। আবার কেউ হয়তো বুঝেও পাত্তা না দিয়ে চলে গেছে।

মানুষের একটা বিশেষ অভ্যাস আছে। আমি মনে করি এক প্রকার নিম্ন মানের মানষিকতা। সে তার গন্ডির বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করতে চায় না। জাত চলে যাওয়ার একটা ভয় থাকে তাতে। কৃত্রিমতায় ভরপুর এই গন্ডিকে আমার কাছে বড্ড বেশি বিরক্তিকর লাগে।

শিতের দিন। বাচ্চা কুকুরটি কয়েকঘন্টা যাবত এভাবে ভিজেছে। পুরো শরীর ভিজে গিয়ে বাচ্চাটার মাথা মোটা আর শরীর চিকন দেখা যাচ্ছে। আমাকে দেখে বাচ্চাটা এগিয়ে আসলো।

আমি হাটু ভাজ করে ধরতে যাবো, এমন সময় কচাত করে আমার প্যান্টটা ছিড়ে গেলো উরুর কাছ থেকে। দেখলাম ছিড়ে যায়নি। সেলাই খুলে গেছে এক ফুটের মতো যায়গা জুড়ে। আমি তাড়াতাড়ি করে বাম হাত দিয়ে প্যান্টটা ধরলাম। খামচি দিয়ে ধরে আলগা প্যান্টের দুই মুখ একজায়গায় করার চেষ্টা করলাম।

উপর থেকে কয়েকজন সরবে হেসে উঠলো। বিভিন্ন অপ্রীতিকর কথা বলে আমাকে নিয়ে তামাশাও করলো কয়েকজন। আমি তাকালাম না। শুধু মনে মনে রাগ হতে লাগলো। বাচ্চা কুকুরটি কাছে আসতেই তার কাধের চামড়া ধরে উপরে উঠালাম। এভাবে তাদের মায়েদের ধরতে দেখেছি। মুখ দিয়ে ধরে। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায় এভাবে। আমাদের বাড়ির পোষা বিড়ালটাও এভাবে তার বাচ্চাদের আনা নেয়া করে।

আমি উপরে উঠলাম। প্যান্ট ছিড়ে গিয়ে শরীর দেখানোর লজ্জা আর মানুষের বিরক্তিকর হাসিতে কষ্ট পাওয়ার কথা ছিলো আমার। কিন্তু মুখে আমার গ্লানিহীন হাসি ফুটে উঠলো। কেননা একটি জায়গায় আমার চোখ আটকে গেলো। তা হলো মা আর বাচ্চার ভালোবাসার মুহুর্তটা।

দশ বছর পর বিদেশ থেকে ছেলে বাড়ি ফিরলে মায়ের অনুভুতি যেমন দেখেছি এখানেও তেমনটাই মনে হচ্ছে আমার। আমার মন চাইলো কাছে গিয়ে বসতে। বসলামও। বাচ্চাটি তখন তার শরীর ঝাড়া দিয়ে গায়ের পচা কাদা আমার শরীরে লাগিয়ে দিলো।

আমার সাদা শার্ট প্যান্ট এ অসংখ্য কালো ছোপ পড়ে গেলো। কিন্তু কেনো জানি আমার মনে হলো এই কালো ছোপগুলো হাসিঠাট্টা করা ওই লোক গুলোর হাসির চেয়ে অনেক বেশি পরিষ্কার।

শীতে বাচ্চাটি কাপছে। শরীর মোছনোর মতো কিছু ছিলো না আমার কাছে। একবার মনে হলো বাসায় নিয়ে যাই। কিন্তু চারতালার রফিক আংকেলের কথা মনে পড়তেই ভাবনাটা বিলীন হয়ে গেলো। রাগি মানুষ তিনি। সবাইকে তিনি বকা দেন। কারণে অকারণে। তাকে কখনো কেউ বকা দিয়েছে এমনটা দেখিনি কোনোদিন।

সরকারী কি যেনো একটা চাকরী করতেন তিনি। সেখানেও এভাবে সবাইকে ধমকাতেন মনে হয়।
বাচ্চাটি বাসায় নিয়ে গেলে আমাকে অনেক কথা শুনতে হতে পারে। তার কথায় কি যেনো একটা মেশানো থাকে। হাইড্রোক্লোরিক এসিডের মতো।

হাইড্রোক্লোরিক এসিড আমাদের পাকস্থলীতে থাকে। এর একফোটা ফ্লোরে পড়লে ফ্লোরও ফুটো হয়ে যেতে পারে। বাচ্চাটি তার মায়ের কাছে। মা তার বাচ্চার কাছে। বিপদ কেটে গেছে। একজন মায়ের আর আকজন সন্তানের বিপদ কেটে গেছে।

আমি বাসার দিকে এগোতে লাগলাম। কাধে ব্যাগ। আবার কুজো হয়ে গেছি। এক হাতে সাদা রঙের শূ। আর এক হাত দিয়ে আমার লজ্জা ঢাকার প্রচন্ড চেষ্টা। মা কুকুরটা একটা অদ্ভুত কান্ড করতে লাগলো। বাচ্চার কাছ থেকে দৌড়ে আমার কাছে আসে। আমার শরীরের গন্ধ নেয়। আবার ছুটে যায় বাচ্চার কাছে। বাচ্চার শরীর জিহবা দিয়ে চাটে।

যতক্ষণ আমাকে দেখা গিয়েছে ততক্ষণ সে এটার পুনরাবৃত্তি করেছে। দূরে বটগাছের সবচেয়ে নিচের ডালের মাথায় সূর্য টা ঝুলে আছে। বিবাহিত হিন্দু মেয়ের কপালের রাঙা টিপের মতো সূর্যটা। মসজিদের বারান্দা থেকে ছোট্ট এতিম ছেলেটা আমাকে অবাক হয়ে দেখছিলো। আমি তাকাতেই মুচকি হেসে দিলো সে।

MD. FOYSAL HOSSAIN FARABI
RN, BSN (in course)
Former(SSN) Central Police hospital,
(SSN) BSMMU.