• আজঃ শনিবার, ১লা কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৬ই অক্টোবর, ২০২১ ইং

আমি এবং আমরার শহরে আপনিও কি আছেন – ফয়সাল ফারাবী

এখানে হেলান দিয়ে বসে থাকা, আধা শোয়া এবং শোয়া অবস্থায় থাকা যে তিনটা ছেলে এই মুহুর্তে আপনার দিকে তাকিয়ে আছে, এদের মধ্যে সবুজ ড্রেস পরা সাদামাটা একটা ছেলেকে দেখা যায়? ওটা আমি(মনে হয়। আমার ২৪ বছর বয়স। ( প্রকৃত হিসাবে ২৪ বছর ৫ দিন । যদিও আমার বয়স নিয়ে বন্ধুমহলে বেশ একটা বিতর্ক এবং কনফিউশন প্রচলিত আছে।

যাই হোক বয়সের হিসাব করলে আমি কিন্তু মোটেই ছোট্ট নই। বড়। বেশ বড়। তাছাড়া পরিবার, সমাজ এবং আমার দেশের প্রতি আমার যে দায়িত্বটা, সেটা কিন্তু বেশ বড় মাপের। পরিবার আর সমাজের প্রতি আমার কি দায়িত্ব সেটা আমার পরিবার এবং আমার সুশীল সমাজের লোকের কাছ থেকে জেনে নিয়েন। ( এখন বলার মুড নেই৷ দায়িত্ব পালনের দিক দিয়ে হলেও আমাকে বড় বলা উচিত। তাছাড়া নিজেকে আজকাল হুদাই বড় বড় মনে হয় ( মনে হয় বিয়ের বয়স চলছে । এটলিস্ট আমার ছোট ভাইদের চেয়ে তো আমি বড় ।

বয়সের কথা উঠানোর একটা বেশ মজাদার কারণ আছে।
আমার হাসপাতালের ইনডোর মেডিকেল অফিসার ড. সানি ভাই মনে করেন আমি এবং আমরা নাকি এখনো বেশ ছোট মানুষ। আমি হলাম আমি। আর আমার সাথে যে দুজন আধা ছোট আধা বড় ছেলে আপনার দিকে হাস্যজ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওরা, আর অন্যরা যারা আমার সাথে কাজ করে, অথচ ফটক তোলার সময় ক্যামেরার পিছনে ছিলো, এবং যে আমার এই সুন্দরতম ফটকখানা ( নানির ভাষ্যমতে ফটক তুলে দিয়েছে এবং যারা ফটক তোলার সময় ডিউটিতে ছিলো না, তারা সবাই মিলে আমরা।।

সদ্য লাইসেন্স প্রাপ্ত হওয়ায় আমরা সবাই প্রায় কাছাকাছি বয়সের হবো। দুই এক বছরের ব্যবধান হবে হয়তো আমাদের বয়সের। সবার বয়স ২২ থেকে ২৫ এর মধ্যে। (আন্দাজে বললাম)। আমি ড. সানিকে সানি ভাই বলে ডাকি। এটা আমাদের ভিতরকার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। অন্যান্য ডাক্তারকে “ডক্টর” বলে ডাকি।

সানি ভাই আমাকে ফয়সাল ভাই বলে ডাকেন। বেশ ভালো মানুষ তিনি। তার পার্সোনালিটিও ফলো করার মতো। সানি ভাই ছাড়াও অন্যান্য ডাক্তার যারা আছেন তারও দু একজন ছাড়া বাকি সবাই ই ফয়সাল ভাই এবং কয়েকজন ডক্টর আপু আমাকে ভাইয়া বলে ডাকেন।

যে দু একজন ডাক্তার আমাকে ফয়সাল ভাই বলেন না তারা “ব্রাদার” বলে ডাকেন।
এই “আমরা” দের একসাথে বসে ফাইল লিখতে দেখলে ড. সানি ভাই আমাদের সাথে মজা করে বলেন, আজ দেখি কচিকাঁচার মেলা বসেছে। (রোজই বসে এই মেলা)। ড. সানি ভাইয়ের মুখ থেকে এই কথাটা শুনতে ভালোই লাগে। এক মুখ পরিষ্কার হাসি নিয়ে কথাটি তিনি বলেন। মাঝে মাঝে পাশের চেয়ারে বসে গল্প শুরু করে দেন। ছোটবেলার গল্প, জীবনের বিভিন্ন সময় ঘটে যাওয়া মজাদার,কষ্টকর বা ভৌতিক ঘটনা। ইতাদি। আমরাও গল্পের তালে গল্পে মেতে উঠি।

হঠাৎ পেশেন্ট এর করুণ ডাকে আচমকা ছেদ পড়ে গল্পের।
ছিচটার…………………
ছিচটার আফা……………..!
কিভাবে ডাকে দেখেন!। তবুও ছুটে যাই। এমন অপ্রিয়কর নামে অন্য কেউ ডাকলে তার সাথে আড়ি করি। পেশেন্ট এর সাথে পারি না। মনোকষ্ট বুকের মধ্যে কোনঠাসা করে রেখে দিয়ে সেবায় মেতে উঠি।
পেশেন্ট এর কপালে কপাল লাগিয়ে ভালোবাসি। সে না বাসলেও আমি আর এই আমরা বাসি। ভালোবাসি।
হাতে হাত রেখে ভরষা দেই, অভয় দেই।
রোগির রোগ আমি এবং আমাদের চোখে, মুখে, নাকে, ফুসফুস, হাড় মাংস রক্ত কণায় বাসা বেধে ফেলে কখনো কখনো।

পেশেন্টকে এই যে অত্যাধিক ভালোবাসা। এটা তার পরিণাম।
মাঝে মাঝে তাই তো এই আমি এবং আমরার মধ্যে থেকে কত আমিকে নিজের জিবনও বিসর্জন দিতে হয়।
পেশেন্ট কান্না করলে আমি এবং আমরা কেদে ফেলি। লুকিয়ে কাদতে হয়।পাছে পেশেন্ট ভয় পেয়ে যায়। বা ভীতিকর কিছু ভেবে নেয়! সহকর্মীরা তখন কোনো পেশেন্টকে আমার এবং আমাদের শশুর, শাশুড়ি, কাউকে দাদাশ্বশুর , কাউকে ভাইরা বানিয়ে দেয় নিছক মজার ছলে বললেও এগুলা শুনে বেশ তৃপ্তি পাওয়া যায়।

আমি আমার হাসপাতালের HDU( High Dependency Unit) ডিপার্টমেন্টে কর্মরত আছি। তবে এখনো অব্দি পরিচয়পত্র হাতে না পাওয়ার কারণে আমার ডেজিগনেশন টা আপনাদেরকে জানাতে পারলাম না (দুঃখিত)। তবে একদিন না একদিন উক্ত জিনসটা ঠিকই হাতে পাবো। ( পরিচয়পত্র বানানোর কাজ চলছে। আমার কাছে ডেমোও আছে। )। একবার হাতে পেলেই আমার ডেজিগনেশন টা আপনাদেরকে সাথে সাথে আপডেট দিবো। (মনে থাকলে)।

আমি এবং আমরা এ বছরই (BNMC) বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল থেকে লাইসেন্স পেয়েছি। প্রথমে চেয়েছি। পরে পেয়েছি। এই চাওয়া আর পাওয়ার মাঝখানে একটা বেশ বড়সড় গল্প আছে (আরেকদিন বলবো)।
লাইসেন্সপত্রে আমাকে “রেজিস্টার্ড নার্স-মিডওয়াইভ” বলে সম্মোধন করা হয়েছে। (BMDC) বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল থেকে লাইসেন্স প্রাপ্তদের “রেজিস্টার্ড ফিজিশিয়ান” বলে সম্মোধন করা হয়ে থাকে এই লাইসেন্স পত্রে।

তবে “রেজিস্টার্ড ফিজিশিয়ান” এবং “রেজিস্টার্রড নার্স-মিডওয়াইভ” শুধুমাত্র কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ। লাইসেন্স এর আয়তাকার গন্ডি পার হয়ে এই নামগুলা সাধারণ মানুষের গা ছুতে পারে না।
সাধারণ মানুষ রেজিস্টার্ড ফিজিশিয়ান কে তাই ডাক্তার, আর রেজিস্টার্ড নার্স-মিডওয়াইভকে “সিস্টার আর ব্রাদার” বলে সম্বোধন করে।() এদের মধ্যে আবার প্রায় অর্ধেক মানুষই ছেলেদের নার্সিং এ কাজ করার বেপারটা জানেই না।
আমার হাসপাতালের একটি মেয়ে ( চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারী ) সেদিন আমাকে “সিস্টার ভাইয়া” বলে ডেকে বসলো একদিন। ()। আমি তাকে ভাইয়া বা নার্স ভাইয়া বলে ডাকতে শিখিয়ে দিলাম।

সে অবাক হয়ে উত্তর দিলো, “কন কি বাইয়া, পোলা মাইনষেরে আবার নার্স কওন যায়?” হেসে দিয়েছিলো মেয়েটি।
সাধারণ মানুষের ধারণা নার্স কথাটি সিস্টার কথাটির চেয়েও অনেক বেশি মেয়েলি। আমাদের অনেক রিজস্টার্ড পুরুষ নার্সেরও ফেইসবুক প্রোফাইলে দেখেছি এবং মুখে বলতে শুনেছি নিজেকে ব্রাদার, ডায়ালাইসিস ব্রাদার, সিনিয়র ব্রাদার বলে ইন্ট্রডিউস করতে। অবাক হই এবং রাগ হয়। ( রাগটাই বেশি হয়। ওই মুহুর্তে তাকে সুইসাইড করার পরামর্শ দিতে মন চায়। জুনিয়র হলে বকা দেই, বুঝিয়ে বলি। সিনিয়রদের সাথে সহজ সমোঝোতায় আসি। ইনডিরেক্টলি ম্যানার শেখাই। কারণ এটা গুড ম্যানার ডেফিসিয়েন্সি একটা ডিসঅর্ডার )তাছাড়া কি?

আমাদের ডেজিগনেশন নিয়ে বেশ একটা থমথমে অবস্থা বিরাজ করে ভিতরে ভিতরে। সিস্টার, ব্রাদার, নার্স, সিনিয়র স্টাফ নার্স, স্টাফ নার্স, রেজিস্টার্ড নার্স।
??????????..
কোন নামে পরিচয় দিতে পারলে মানুষ আমাকে এমন নামে ডাকবে যে নামটি
শুনলে শরীরের শক্তি বড়ে যায়! নির্ঘুম রাতেও চোখের সামনের সবকিছু ঝাপসা দেখতে হয় না। ক্লান্তি সব গা ঝাড়া দিলে ধুলোর মতো ঝরে পড়বে?

দ্বিতীয় শ্রেণীর একজন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার সময় চতুর্থ শ্রেনীর লোকেদের কাছ থেকেও উগ্র মেজাজ এর মুখোমুখি হতে হয়েছে এই প্রফেশনের কারো কারো। এরকম অসংখ্য আনএক্সপেক্টেড ঘটনা ঘটে এখানে। কারো দৃষ্টিগোচর হয় না। ( আই ওয়ান্ট টু বি সাইলেন্ট হেয়ার )।
কিছু কিছু নার্স তার নামের আগে বা পরে নার্স শব্দটি বসানোরও যোগ্যতা রাখে না। এমন অনেক দেখেছি। ( অলসো আই ওয়ান্ট টু বি সাইলেন্ট হেয়ার)

আমি হয় সত্য বলি না হয় চুপ থাকি। এটা আমার অভ্যাসগত কিংবা জিনেটিক কারণে হয়ে থাকে। গ্রেগর জোহান মেন্ডেল বেচে থাকলে এবং আমার বেপারে ভালোমত জানতে পারলে তিনি বলতেন জিনেটিক কারণে আমি এরকম। কিন্তু পরিচিত লোকেরা আমার অভ্যাসকেই সরাসরি দোষারোপ করে। অনেকেই এটাকে বদভ্যাস বলে থাকে। কারণ সত্য বলা এবং চুপ থাকার মাঝখানে আরেকটা ঘটনা নতুন নতুন গল্প তৈরি করে কোনোকোনো সময় । আর সেটা হচ্ছে, অস্বাভাবিক এবং অনৈতিক কোনোকিছু চোখের সামনে ঘটতে দেখলে সেখানে আমার ক্রোধের আগুনে শয়তানও ভস্ম হয়ে যায়।
[রেগে গেলে আমার মাথার চুল খাড়া হয়ে যায়, চোখ জ্বালা করে আর স্টেইন গানের মতো মুখ থেকে শব্দ বোমা বের হতে থাকে ( শুদ্ধ ভাষায়) ]।

তবে আমি আমার পেশেন্ট কে বকা দেই না। কথা না শুনলে তার সাথে লম্বা সময় গল্প করি। এখানে আমার ধৈর্য্যশক্তি সিদরাতুলমুনতাহা থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত দীর্ঘায়িত। ( আলহামদুলিল্লাহ )

যাই হোক এই যে আমি এবং আমরা মিলে একটা সোসাইটি, এই সোসাইটির প্রায় সবারই একটা বেপারে জানতে চাওয়ার বেশ আগ্রহ আছে। ( বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে ডাটা কালেক্ট করেছি)। সেটা হলো, “রেজিটার্ড ফিজিশিয়ান”কে মেডিকেল অফিসার, এমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার, ইনডোর মেডিকেল অফিসার, রেসিডেন্সিয়াল মেডিকেল অফিসার ( ডক্টরদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি) নামে ডাকলে, “রেজিটার্ড নার্স-মিডওয়াউভ” দের কি “নার্সিং অফিসার” বলে ডাকা যেতে পারে?☺
ভালো একটা নামে ডাকলে সবাই খুশি হয়। আমি লক্ষ্য করেছি, আমাদের হোটেলের ছেলেদের পিচ্চি, এই ছেলে, এই বেটা বলে ডাকা কাস্টমার এর চেয়ে নাম ধরে ডাকা কাস্টমাররা সার্ভিস ভালো পেয়েছে। একটু নরম স্বরে ডাকা কাস্টমারগুলো আরো বেশি ভালো সার্ভিস পায়।

কিছু কাস্টমার সম্মোধনটা মার্জিত ভাষায় করেছে।
ফলে কি হয়েছে? সেবা দানকারী এবং সেবা গ্রহণকারী দুজনেই দুজনের সাথে কো-অপারেশন করলো। এবং এতে করে দু পক্ষই সন্তুষ্ট।

প্রয়োজনের খাতিরে মানুষ মানূষের সাথে কথা বলে। কথা ভয়ংকর জিনিস। কথার কারণে হিরোশিমায় লিটলবয় বিস্ফোরিত হয়। কথায় শান্তিচুক্তি সাক্ষরিত হয়। কথার শক্তিতে আয়তাকার শক্তিশালী মানচিত্র থেকে ব-দ্বীপ স্বাধীন হয়। কথার শক্তিতে রোহিঙ্গারা বাংলার ধুলোয় আশ্রয় পায়। কথার যাদুতে রিকশাওয়ালা ত্রিশ টাকার পথ বিশ টাকায় বায়।
সুতরাং কথার সাথে সম্মোধন যোগ করতে হবে। সম্মানিত সম্মোধন।