• আজঃ বৃহস্পতিবার, ১লা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং

আল্লাহ হায়াত যতদিন রাখে বান্দা ততদিনই বাচে

“তারপর কি হলো?”,
তারপর, এক মাস বিছানা দিয়ে উঠতে পারিনি। প্রচন্ড যন্ত্রণা হত।মনে হত নিঃশ্বাসটা বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ হায়াত যতদিন রাখে বান্দা ততদিনই বাচে।আমিও মরলাম না।

বারান্দায় কফি নিয়ে কথা বলছে মিতা আর হালিমা। হালিমার কথা শুনে চোখের পানি আর আটকাতে পারেনি মিতা।চোখ মুছে আবার জিজ্ঞেস করল,”আল্লাহ তোকে আসলেই অনেক ধৈর্য দিয়েছে।এত জুলুম সহ্য করেও সেই বাবা মায়ের সাথে কত সুন্দর ব্যবহার করিস!আজ ছয় বছর তোকে চিনি।তোর বাসায় গেলে বুঝতেই পারি না তারা তোর সাথে কোনোদিন খারাপ ব্যবহার করেছিল।

হালিমা বলল,”বাবা মায়ের সাথে উহ্ শব্দটাও করা যাবে না।তারা যতই যা বলুক।আল্লাহর পরীক্ষা ছিল। হিন্দু থেকে মুসলিম হলে তো সাহায্য পাওয়া যায়। কিন্তু মুসলমানের ঘরেই জন্মে ইসলাম মানতে গেলে জীবন বাজি রাখতে হয় তা আগে জানতাম না।”
মিতা বলল,”আল্লাহ তোকে অনেক শান্তিতে রাখুক।ভালো রাখুক।

“শত প্রতিকূলতার মধ্যেও আল্লাহর বিধান মানা,তার ইবাদত করাতেই মুসলিমের ভালো থাকা,শান্তিতে থাকা।আমি আল্লাহর ভালোবাসা পেয়েছি।হেদায়াত পেয়েছি এটাই আমার জীবনের সব শান্তি।”,উত্তর দিল হালিমা।
“উঠি রে,বাসায় যাই। তোর ভাইয়ার(মিতার স্বামী) আসার সময় হয়ে গেছে।”
“আচ্ছা,আবার কবে আসবি?”, জিজ্ঞেস করল হালিমা।
“তাড়াতাড়ি ইনশাআল্লাহ।”,তড়িঘড়ি করে উঠে গেল মিতা।
মিতা যাওয়ার পর আযান দিতেই মাগরিবের নামাজ পড়ে নিল হালিমা।সবুজের জন্য নাস্তা বানাতে গেল। রান্না করতে করতে অতীতের স্মৃতি চারণ করতে লাগল।

২. খুব ছোটবেলা থেকেই রাগী স্বভাবের ছিলো হালিমা।কিন্তু হেদায়াত পাওয়ার পর নিজের ভুল বুঝতে পারে।যে মেয়ে কিছু দিতে দেরি হলেই রাগ করত বাবা মায়ের উপর। কাঁচের জিনিস ভাঙচুর করতে সেই মেয়ে বাবা মা যা বলে তাই শুনে।এমনকি মা না চাইতেই তার কাজে সাহায্য করে। এমন পরিবর্তনে খুশিই হয় তার বাবা মা।

কিন্তু বিপত্তি ঘটে যখন হালিমা নন মাহরামের সামনে যাওয়া বন্ধ করে।ওর বাবা এমনিতেই খুব রাগী মানুষ। ছোটবেলা থেকেই ওর মাকে অনেক অত্যাচার করত।আর সমাজে ওনার একটা অবস্থান আছে।ওনার মেয়ে হবে শালীন, ভদ্র।নামাজ পড়ে এটা ঠিক আছে। কিন্তু তাই বলে চাচাত ভাইয়ের সামনে যাবে না।একে তো বিয়েই দেয়া যাবে না।মাথায় ওড়না থাকলেই তো হয়। আবার মুখ ঢাকার কি দরকার।তাও আবার চাচাত ভাইয়ের সামনে।

আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই হালিমার।হাতের দিকে তাকাতেই দেখে অনেক খানি কেটে গেছে।ওর বাবা একটু আগে বেত দিয়ে প্রচন্ড মারল।মুন্সিগিরি ছুটিয়ে দিতে চায় মেয়ের।এত টাকা দিয়ে মুন্সী বানাবে না সে।তাই সাফ জানিয়ে দিলো যে বাসায় কোনো আরবি টিচার আসবে না।হালিমা কেবলই কুরআন শুদ্ধ করে পড়া শিখছে। এখনই বাদ দিলে পুরো কুরআন একবার শুদ্ধ করে আরবি আপার কাছে আর পড়া হবে না।কেবল ৩ পারা শেষ করছে আপার কাছে।কষ্টে চোখ থেকে অনবরত পানি পড়তে লাগল।

প্রথম যখন নন মাহরাম মেইনটেইন করা শুরু করে তখন ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়ত। তখনত থেকেই বাবা মায়ের শারীরিক মানসিক নির্যাতন শুরু।মা কখনো গায়ে হাত তুলত না।কিন্তু বাবা প্রায়ই ওকে মারত।শুধুমাত্র শরীয়া মোতাবেক পর্দা করার জন্য।একবার তিনমাস বিছানায় পড়ে ছিলো। ডাক্তার ও দেখিয়েছে অনেক। হাজার হলেও নিজের মেয়ে।তারা শুধু মেয়ের ঘাড় থেকে হুজুর হওয়ার ভূত ছাড়াতে চায়।

ক্রমাগত অসুস্থতায় দিন যায় হালিমার। পড়াশুনার অবস্থা নাজেহাল।ডাক্তাররা বারবার জিজ্ঞেস করে কোনো আঘাত পেয়েছ?তোমার এত অল্প বয়সে হাড় ভাংগল কিভাবে?ও কিছুই বলতে পারে না।চুপ করে থাকে।

অনেক ঝড় গেল ওর উপর দিয়ে। কিন্তু এত ঝড়ের মধ্যেও আল্লাহর উপর ভরসা রেখেছে সে।নিজে লুকিয়ে টিউশনি করিয়ে আরবি ভাষা অনেকটাই শিখল অনলাইনে।সাথে হিফজ ও করতে লাগল।কুরআনের অর্ধেক আয়ত্ত করল ও।একটা দিনের জন্য ও তাহাজ্জুদ ছাড়েনি ও।

এর মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা হল।রেজাল্ট আশানুরূপ হলো না।বাসায় অনেক কিছু হলো।অনেক কথা শোনাল।বাসার সবাই বলল হুজুর হয়েই আজ এই দশা।এডমিশন হল।বাসা থেকে অনেক দূরে একটা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হল হালিমা।হাফ ছেড়ে বাচল যেন!
ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার দুই বছর পরে এক ইঞ্জিনিয়ারের সাথে বিয়ে হয়ে গেল।আল্লাহ ওকে অনেক কিছু দিয়েছেন এই জীবনে।শুকরিয়া আদায় করে শেষ করতে পারবে না ও।আলহামদুলিল্লাহ।

৩. কলিংবেলের আওয়াজ পেয়েই বুঝল সবুজ এসেছে।ঢুকেই সালাম দিলো হালিমা।সবুজকে প্রথমে সালাম দেওয়ার সুযোগ খুব কমই পায় হালিমা।আল্লাহ তার এই বান্দীকে এত এত নিয়ামত দিয়েছেন।সব থেকে শ্রেষ্ঠ উপহার হল সবুজ।এমন একজন স্বামীই সে চেয়েছিল তার জীবনে।সবুজ সবসময় ওকে দ্বীন মানতে সাহায্য করে।
“আপনার নাস্তা রেডি।”, হালিমা বলল।
” আজকে কি রান্না করলেন মহারাণী?”
“চটপটি “, হালিমা উত্তর দিল।
“দুনিয়ার সবচেয়ে মজার খাবার খেতে যাচ্ছি!”, হালিমাকে বলল সবুজ।
” আর প্রশংসা করতে হবে না।”

এমন সময় এশার আযান দিল।সবুজকে মসজিদে যেতে তাড়া দিলো হালিমা,”আযান দিছে। নামায পড়তে যান।”
যাচ্ছি মহারাণী, মসজিদের দিকে পা বাড়াল সবুজ।মিষ্টি হেসে সবুজকে সালাম দিল হালিমা।নিজেও নামাজে চলে গেল। যে মালিক তাকে এত দিয়েছেন তার শুকরিয়া আদায় করতে।আল্লাহ তাকে হেদায়াত না দিলে কি সবুজের মত এত ভালো মানুষ পেত জীবনে?বাবার বাড়িতে অনেক কষ্ট সহ্য করেছে সে।কিন্তু আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার তুলনায় তা কিছুই না।মালিক তোমার এই বান্দীকে তুমি ক্ষমা করে দাও।তোমার কৃতজ্ঞতা আদায়ের সুযোগ দাও। অশ্রুসিক্ত নয়নে পরম আনন্দে বলে ওঠে হালিমা।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা বলেছেন,
وَوَجَدَكَ عَآئِلًا فَاَ غْنٰى
“তিনি তোমাকে পেলেন নিঃস্ব, অতঃপর করলেন অভাবমুক্ত।”
(সূরা আদদুহা আয়াত ৭)

| কৃতজ্ঞতা |
লেখা: মাহজাবিন আফরিন