• আজঃ শুক্রবার, ২৮শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১২ই আগস্ট, ২০২২ ইং

একটি বিজয়ের গল্প – ফয়সাল ফারাবি (৩য় পর্ব)

একটি বিজয়ের গল্প
৩য় পর্ব……..

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোভিড-১৯ ভ্যাক্সিন সেন্টারে ডিউটি করছি। মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র আঙিনায় আজ কেনো জানি অতীতের পাঁচমিশালি সব সাদাকালো, রঙিন আর মলিন স্মৃতির আনাগোনা।
কেনো? জানিনা। কিন্তু কেনো জানিনা? ও হ্যাঁ। জানি। রাতে একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম। ঘুম ভেঙে গিয়েছে তখন। আর ঘুমাতে পারিনি। বড় অবেলায় তাই

স্মৃতির আগমণ এই স্বপ্নের সূত্র ধরেই।
যাই হোক একজন প্রবাসী বাংলাদেশি ভ্যাক্সিন গ্রহীতার কন্ঠ শুনে ভাবনায় ছেদ পড়লো আমার।
একটা ছেলে। সতেরো কি আঠারো। বা উনিশ। মুখের দিকে তাকালাম।
বললাম টোকেনে সিরিয়াল নাম্বার দেয়া আছে। সিরিয়াল অনুযায়ী ডাকা হচ্ছে। অপেক্ষা করুন।
স্যার আমার একটু অসুবিধা আছে। আমাকে একটা সাইন দিয়ে দেন। ভ্যাক্সিন নিয়ে তাড়াতাড়ি চলে যাবো।
কি অসুবিধা? প্রশ্ন করলাম।

স্যার আম্মা হাসপাতালে। আজ অপারেশন এর ডেট। আর ভ্যাক্সিন এর মেসেজটাও আজকের তারিখে।
চোখের দিকে তাকালাম। ছেলেটা মিথ্যা বলছে না। থমকে থেমে গেলাম। হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিয়ে সাক্ষর, সিল এবং ভ্যাক্সিন এর পরবর্তী তারিখ লিখতে লিখতে বললাম, কি হয়েছে আম্মার?
স্যার পিত্তথলিতে পাথর।

হায়…………আমি আবার হারিয়ে গেলাম সেদিনকার সেই যাত্রাপথের মলিন মুগ্ধতায়। বাসে ওঠার সময় মায়ের মুখের দিকে যখন তাকিয়েছিলাম বুঝেছিলাম মা আমার বিদ্ধস্ত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হিরোশিমায় লিটলবয় আর নাগাসাকিতে ফ্যাটমান বিস্ফোরণের ঘটনা শুনেছিলাম। তীব্র শক্তিশালী সে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর সেখানকার প্রকৃতির চেহারা ঠিক কেমন ছিলো সেটা বহুবার বহুরুপে কল্পনায় এঁকেছি। কিন্তু মেলাতে পারিনি কোনোদিন। সেদিন প্রথম মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ক্ষত বিক্ষত সে চেহারার দিকে তাকিয়ে হিরোশিমা আর নাগাসাকির করুণ পরিণতি উপলব্ধি করেছিলাম।
বাস চলা শুরু করলে আমি আমার যাত্রা শুরু করি। একটা ছোট্ট হলুদ রঙের মুরগির বাচ্চা পানিতে পড়ে গেলে ভেজা শরীর নিয়ে তীব্র শীত থেকে বাচতে যেভাবে উষ্ণ হওয়ার জন্য মাকে খুজে বেড়ায় আমি সেভাবে খুঁজে পাওয়ার আশায় আশেপাশে তাকালাম। সবাই আছে। মা নেই। মা আছে। তবে কাছে নেই।

মাকে রেখে দূরে কোথাও সরিয়ে নেয়া হয়েছে আমাকে। প্রকৃতি এটাই চেয়েছিলো।
আম্মু রুটি বানিয়ে দিয়েছিলো। সাথে আলু ভাজি, ডিম আর এক বোতল পানি। সেগুলো ব্যাগেই রয়ে গেছে। খাইনি। বিভোবিন্দু দাদা আমাকে অনেকবার খেতে বলেছিলেন। বলেছিলাম, ক্ষুধা নেই।

রাত যখন সাড়ে এগারোটা তখন বাসের সুপারভাইজার এসে বললো, আপনার নাম কি ফয়সাল?
আমি বিভোবিন্দু দাদার দিকে তাকালাম। ভয় পাচ্ছিলাম। নাম জিজ্ঞাসা কেনো করছে? বাসে করে মাদক পাচার হয়, পুলিশ জানতে পারলে অপরাধী সরে পড়ে। আশেপাশের সিটে থাকা যাত্রীদের তখন হেনস্থা হতে হয়। এমন অনেক ঘটনা শুনেছি।
আমি কি বিপদে পড়তে যাচ্ছি? মনে মনে ভাবলাম।

আপনার খালাম্মা ফোন দিয়েছিলো। কাউন্টার থেকে নাম্বার নিয়েছে। আপনাকে ফোনে পাচ্ছে না বলে। কিছুক্ষণের মধ্যে নবীনগর পৌঁছে যাবো। আপনার খালাম্মা স্মৃতিসৌধের এক নাম্বার গেইট এ আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। এতক্ষণ অজানা বিপদের শঙ্কায় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল আমার। অযথা ভয় পেয়েছি। ভয় পেয়েছি কারণ যেখানে ভয় পাওয়ার কথা সেখানে সবাই ভয় পায়।

বিভোবিন্দু দাদার কাছে থেকে বিদায় নিলাম। পা রাখলাম যাদূর শহরে।
কাধে ব্যাগ। হাতে বন্ধ হয়ে যাওয়া মোবাইল। মনে অজানা ভয়। পায়ের নিচে অচেনা শহর। আর শীতের রাত। ক্লান্তিতে পা উঠতে চাইছে না। এত লম্বা সময় জার্ণি করিনি কোনোদিন।

কাছেই একটা তেলের পাম্প আছে। কুয়াশায় ছেয়ে আছে চারপাশ। লক্ষ্য করলাম, তেল পাম্পের কাছে একটা ছোট্ট টেবিল।
ফ্লেক্সিলোড এর দোকান। লোকটা জিনিসপত্র গোছাচ্ছে। এগিয়ে কাছে গেলাম।
আংকেল, আমার ফোনটা অফ হয়ে গেছে। আপনার ফোনে আমার সিমটা লাগিয়ে একটু কথা বলতে পারি?
না। ফোনে কথা বলার ব্যাবস্থা আছে। ৫ টাকা মিনিট। সিম লাগিয়ে কথা বলার ব্যাবস্থা নেই।
নাম্বার মুখস্থ নেই। ফোনটা একটু দেন। রাত হয়ে যাচ্ছে। আমার কথা বলাটা অনেক জরুরি। আংকেল……………….
লোকটা আমার কথা না শোনার ভান করে খাতা পত্র নিয়ে চলে গেলো। আমি তার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
রাত বাড়ছে। কুয়াশায় ছেয়ে যাচ্ছে কালো রাত।
চলবে……

দুঃখিত! কপি/পেস্ট করা থেকে বিরত থাকুন।