• আজঃ বুধবার, ১লা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৪ই এপ্রিল, ২০২১ ইং

আহারে বাছের ভাইয়ের টেলিভিশন

আমাদের বাড়ির দরজায় বাছের ভাইয়ের দোকানটা এখনো আছে। তখন দোকানে গ্রামের ছোট বড় সবাই মিলে আড্ডা চলতো সেইরকম। কত সাল এক্সাক্টলি মনে নেই? ওই সময় বিটিভিতে বিকেলে শুক্রবারে বাংলা মুভি দেখাইতো। এইরকম একটা শুক্রবারে চিন্তা করলাম দোকানে বসে মুভি দেখবো এবং মন চাইলে চা বিস্কুট ও খেতে পারবো।

বাছের ভাইয়ের দোকানের বাইরে বসার জন্য তখন মাচা ছিল। যাই হোক বিকেল ৩.৩০ এর দিকে মুভি শুরু হবে, আর এইদিকে পুরা দোকান ভর্তি মানুষে ভরপুর। মুভি শুরু হবার পূর্বেই উনার সাফ কথা, কিছু খাইলে টেলিভিশন চলবে? না খাইলে টেলিভশন বন্ধ করি দিমু। ১৪ ইঞ্চি রঙিন টেলিভশন, উনার ভাব সাবই অন্যরকম। ভিতরে অনেক মানুষ থাকায় বাইরে মাচার উপর বসলাম। বসতে না বসতেই উনি কয় চা দিমু নি? আমি কইলাম মাত্র আসলাম এখন কিসের চা খামু? আস্তে ধীরে আছরের নামাজ পড়ে এসে না হয় চা খামু। ওমা হেমিয়া কয়, তাইলে আছর নামাজ পর্যন্ত টেলিভশন বন্ধ রাখমু, হেরপর নাইলে চালু করমু।

এই কথা শুনার পর মনে হইলো চায়ের কেটলি টা নিয়া মসজিদের মাঝ পুকুরে ছুঁইড়া মারি, বসতে না বসতেই মেজাজ টা চরম খারাপ কইরা দিলো।এইদিকে উনি হুট করেই টেলিভশন বন্ধ করে ফেলায় যারা টাকা দিয়া চা বিস্কুট খাইলো তাদের তুমুল প্রতিবাদের মুখে পইড়া উনি যা করলো আপনারা চিন্তা ও করতে পারবেন না, যারা যারা চা বিস্কুট খাইলো তাদেরকে ভিতরে রাইখা বাকিদেরকে দোকান থেকে প্রথমে বাহির করলো, এরপর আমরা যারা মাচায় বসে বাহির থেকে দেখতেছিলাম তাদের জন্য উনি দোকানের শাটার পুরোটা বন্ধ কইরা দিলো, এই ঘটনার পরে অনেক বছর উনার দোকানে চা পান করি নাই। সামনে দিয়ে গেলেই খালি উনার ঐসব কথা মনে পড়তো। ওই সময়ের সেন্সেশন ছিল টেলিভশন দেখা, তাও সবাই মিলে মিশে দেখতাম। এখন ঘরে হাই ডেফিনেশন স্মার্ট টিভি, কিন্তু দেখার সময় নাই, আফসোস।

গতবার যখন দেশে গেলাম, দেখি এখন আর ওই সমস্ত জিনিস চলে না, গ্রামের মানুষ জন এখন অনেকেই শহরমুখী কিংবা প্রবাসে ছুটছে। আগের সময়ের মত দোকানে আড্ডা দেবার তেমন মানুষজন দেখলাম না। আছে গুটিকয়েক কিন্তু আগের মত সেই জিনিসগুলো দেখি নাই। যে যুগ আইছে সবাই ফোনের উপর ঝাপাইয়া পড়ছে। অবশ্য এই যুগের কাছে ফোনই হচ্ছে অনেকের শৈশব, কিন্তু আমাদের সময়ের শৈশব ছিল অনেকটা ভিন্ন। এখন বাছের ভাই টেলেভিশন না দেখলে ও জোর করে চা নিয়ে আসে, এবং মাঝে মাঝে মাঝে বলে থাক টাকা দিতে হবে না।

প্রশ্ন হইলো এই টাকা দিতে হবে না বলা মানেই পাঁচশো কিংবা এক হাজার টাকার ধাক্কা, যাই হোক এই মানুষগুলো ছিল বিধায় হয়তো আমাদের শৈশবের এই রকম হাজারো গল্প গুলো তৈরী হয়েছে, মাথা গরম হয়ে গেলে ও জীবন এখন অনেক মধুর স্মৃতি খুঁজে পায় উনাদের এইসব ছোট ছোট কথাগুলোতে। উনারা সবাই ভালো থাকুক, আমার গ্রামের ছোট বড় সবাই আমার খুব প্রিয় মানুষ। গ্রামে গেলেই এখনো রাস্তায় দাঁড়ালে মুরব্বি থেকে ছোট মানুষগুলো যে পরিমান ভালোবাসা কিংবা শ্রদ্ধা দিয়ে বুকে টেনে নেয়, ঠিক তখন মনে হয় ওটাই সর্বযুগের সবচেয়ে সেরা প্রাপ্তি। উনাদের সবার মঙ্গল কামনা করছি, স্রষ্টার নিকট প্রার্থনা, মহান রাব্বুল আল আমিন সবাইকে ভালো রাখুন, সুস্থ রাখুন।
ছবি: সংগৃহিত

লিখেছেন – গোলাম মাহমুদ মামুন
ভার্জিনিয়া , আমেরিকা