• আজঃ বুধবার, ১লা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৪ই এপ্রিল, ২০২১ ইং

দ্যা সুপারম্যান অফ নার্সিং- ফয়সাল ফারাবী

আইসিইউ থেকে বের হতেই মেয়েটা দৌড়ে এসে আমাকে বললো, থ্যাংক্স এ লট সুপারম্যান!!! জবাবে আমার কি বলা উচিত মাথায় আসছিলো না তখন। তাকিয়ে রইলাম শুধু। চোখ দুটো ফুলে গেছে মেয়েটার। এক গুচ্ছ গোলাপ অতি মূল্যবান ফুলদানিতে পরম যত্নে পানি ছিটিয়ে রেখে দিলেও জীবন রসের অভাবে গোলাপের চেহারায় দিনশেষে যে জীর্ণতা লক্ষ্য করা যায়, মেয়েটার চেহারাটা ঠিক তেমন দেখালো। অতি সুন্দর। কিন্তু জীবনরস ছাড়া। তবে ফুলদানির মতো মূল্যবান রঙিন পোশাকে মোড়ানো। মেয়েটা কাদছিলো। আমাকে দেখেই করুণ সে কান্নার মধ্যেই হেসে দিলো। হাসির মধ্যে এক পৃথিবী সমান কৃতজ্ঞতা। বছর বিশেক বয়স হবে মেয়েটার। মনে হয়। শুধু মেয়েটাই নয় তার পরিবারের সব লোকের চোখেই জিনিসটা লক্ষ্য করলাম।

একেক করে ফ্যামিলির প্রায় দশ জন লোক আমাকে ঘিরে ধরলো। আমার গায়ে, মাথায় হাত দিয়ে বিভিন্ন এক্সপ্রেশন ও আলাদা আলাদা স্টেটমেন্টে আমাকে ধন্যবাদ দিতে লাগলো। কৃতজ্ঞতা জানাতে লাগলো। এক আন্টি আমাকে বললো বাবা তুমি মানুষ না, ফেরেশতা। তুমি আমার স্বামীকে নতুন জীবন দিলে আজ। তোমাকে আমি সারাজীবন মনে রাখবো।

মানুষকে এত ক্ষমতা দেয়া হয়নি। মানুষ চাইলেই কারো জীবন বাচাতে পারে না। হায়াত থাকতে হয়। তাছাড়া কার প্রয়োজনে কে কোথা থেকে সময়মতো হাজির হয়ে এসে সাহায্য করবে তা পূর্ব নির্ধারিত। সৃষ্টিকর্তা এসব পরিকল্পনা আগে থেকেই করে রেখেছেন। এখানে আমি হলাম মাধ্যম। আমার বিশেষ কোনো সুপার পাওয়ার নেই। এবং আমি সুপারম্যানও নই। মানুষ। আপনাদের মতোই একজন মানুষ। আন্টির কাধে হাত রেখে আমি বললাম।

দোয়া করি, দোয়া করি। আমাকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলো তারা। তারা পেশেন্ট এর এটেন্ডেন্ট। মাত্র যে পেশেন্টকে আইসিইউতে আনা হলো তার এটেন্ডেন্ট। তারপর আমি সিড়ি দিয়ে নেমে গেলাম। লক্ষ্য করলাম তারা সবাই আমার পিছু পিছু সিড়ি পর্যন্ত আসলো। এবং যতদুর দেখা গেলো আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।

ভাবছেন এতগুলো কথা কেনো বললাম এতক্ষণ? কারণ আছে। শুনবেন? আমি একটু বাচাল গোছের। সবাই বলে। এবং আমিও বুঝতে পারি। কিন্তু এই যে আমি বাচাল এতে করে আমার পেশেন্টরা বেশ উপকৃত হন। তাদের সাথে গল্প করি। অনেকটা সময় নিয়ে গল্প করি। এতে পেশেন্ট এর মন ভালো থাকে। দেখা গেছে একই রোগে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে যাদের মন ভালো থাকে তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মন খারাপ করে থাকা রোগির চেয়ে আগে আগে সুস্থ্য হন। মেডিকেল সাইন্স বলে, শারীরিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য মানষিক স্বাস্থ্য ভালো রাখা জরুরী।

যাই হোক আসল কথায় আসি। আমি একজন নার্সিং অফিসার। কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল আমার কর্মস্থান। আজ আমার ডিউটি নেই। কিন্তু বিশেষ ব্যাক্তিগত একটি কাজে আমাকে হাসপাতালে আসতে হয়েছিলো। কাজ শেষে হাসপাতালের এক নাম্বার গেট দিয়ে বের হয়েই লক্ষ্য করলাম প্রাইভেটকার থেকে দুজন লোক দ্রুত বের হয়ে হাসপাতাল এ-র গেটের মধ্যে তড়িঘড়ি করে ঢুকে গেলো। যাওয়ার সময় আমাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে গেলো একজন। আমি স্লিম-ফিট ফিগারের হওয়ার বেশ ঝক্কি পোহাতে হলো সে ধাক্কা সামলাতে। প্রায় দু হাত পিছিয়ে গিয়ে পড়ে যেতে যেতেও নিজেকে সামলে নিলাম।

বিশেষ কোনো কারণ না থাকা সত্বেও আমাকে ধাক্কা দিলে আমি ঠিকই ব্যবস্থা নিতাম। আমি বেশ প্রতিবাদি, দুরন্ত এবং সাহসী। তবে পুরোটা বুক জুড়েই মানুষের জন্য অবিরাম ভালোবাসা। বুঝতে পারলাম তারা রোগি নিয়ে এসেছে হাসপাতালে।

মানুষের আপনজন এ-র কোনো বিপদ হলে তার ব্রেইন ডিজওরিয়েন্টেড হয়ে যায়। তখন সে কি করছে এবং তার কি করা উচিত তা বুঝে উঠতে পারে না। মানে যে লোকটা আমাকে মাত্র ধাক্কা দিয়ে গেলো সে লোকটার ব্রেইন গোল-ডিরেক্টেড না। তাই তাকে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে আমি গাড়িটার দিকে জোর পায়ে হেটে গেলাম।
আমার মনে হতে লাগলো গাড়িতে যে রোগীটা আছে তার অবস্থা ক্রিটিক্যাল হবে হয়তো। যদি তাই না হবে তাহলে তাদের চোখে মুখে এত আতঙ্ক কেনো?! যদিও পরিবারের কেউ অসুস্থ্য হলে আতঙ্কিত হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এটারও একটা মেজারমেন্ট আছে। দীর্ঘদিন ক্রিটিক্যাল পেশেন্টের এটেন্ডেন্ট দের এক্সপ্রেশন-এট্টিটিউড দেখতে দেখতে আমার ছোটখাটো একটা আইডিয়া হয়ে গেছে এই আতঙ্ক এবং এক্সপ্রেশন সম্পর্কে। তাদের আতঙ্কিত হওয়ার মেজারমেন্টটা তুলনামূলক বেশি মনে হলো আমার কাছে।

প্রাইভেট কারের গ্লাস দিয়ে ভিতরে তাকিয়েই বুঝলাম পেশেন্টকে এখনই এটলিস্ট ফার্স্ট এইড দিতে হবে। আদারওয়াইজ আফটার ফিউ মিনিটস হি উইল এক্সপায়ার। পেশেন্ট সায়ানাস্ট(রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া, এর সিম্পটম হচ্ছে, ঠোট,নখ এবং মিউকাস-মেনব্রেন নীলাভ বর্ণ ধারণ করা) ছিলো। আমি কাউকে কিছু না বলেই দ্রুত গাড়ির দরজা খুলে পেশেন্ট এর আঙুলে পালস-অক্সিমিটার (অক্সিজেন ও হার্টবিট মাপার যন্ত্র) লাগালাম। আমার কাধে ব্যাগ থাকায় পালস-অক্সিমিটার টা সাথেই ছিলো। এটা আমার ব্যাগেই থাকে সবসময়।

অক্সিজেন এর পরিমান নরমাল এডাল্ট এর ৯৩ শতাংশের উপরে থাকে। এটাকে অক্সিজেন স্যাচুরেশন বলা হয়। এটার পার্সেন্টেন্স ৯৩ এর চেয়ে কমে যেতে থাকলে অভ্যান্তরীন ভাবে বিভিন্ন অর্গানের ক্ষতি হতে থাকে। পেশেন্ট এর স্যাচুরেশন ৩৬ শতাংশ ছিলো, যেটা কিনা সত্যিই তার জন্য গুরুতরভাবে বিপদজনক।

পেশেন্টকে অক্সিজেন দেয়া হচ্ছিলো ন্যাজাল ক্যানুলার মাধ্যমে। চার লিটার্স ফ্লোতে। যেটার পরিমাণ তার মোট অক্সিজেন চাহিদার তুলনায় একেবারেই কম। ন্যাজাল ক্যানুলার মাধ্যমে সর্বোচ্চ পাঁচ লিটার্স পর্যন্ত অক্সিজেন দেয়া যায়। আমি তখন চেচিয়ে বললাম ফেইস মাস্ক বা এনআরবি (দুইটা-ই অক্সিজেন দেয়ার মাস্ক, এগুলার মাধ্যমে রোগিকে বেশি করে অক্সিজেন দেয়া যায়) দেন আমাকে, কুইক!!!একজন আমাকে একটা সার্জিক্যাল মাস্ক দিলেন। বললাম এটা না। আপনারা পেশেনটকে কেনো এম্বুলেন্স করে আনলেন না! পেশেন্ট পার্টি একেকজন একেক রকমের জবাব দিতে লাগলো। আমি কর্নপাত করলাম না।

ভিতর থেকে আন্টিকে (পেশেন্টের ওয়াইফ) বের হতে বললাম। তারপর পেশেন্টকে সাইড লাইং পজিশনে( একদিকে কাত করে) শুইয়ে দিলাম। এভাবে শুইয়ে দিলে পেশেন্ট অক্সিজের সাপ্লাই ভালো পায়। প্রোনিং পজিশনে(উপুড় করে) শুইয়ে দিলে অক্সিজেন সাপ্লাই আরো ভালো পাওয়া যায়। কিন্তু প্রাইভেট কারের ভিতরের জায়গা অনেক বেশি ন্যারো হওয়ায় প্রোনিং করা গেলো না।

পেশেন্টকে শুইয়ে দেয়ার পর আমাকে একজন বলল, রোগির ছেলে। মনে হয়। হোয়াট ইউ ডুইং? হোয়াট ইউ ওয়ান্ট টু ডু?? হু আর ইউ? লেইট মি হ্যান্ডেল দিস। আই-ম দ্যা নার্সিং অফিসার। হি হ্যাজ বিন সাফারিং ফ্রম এ লাইফ থ্রেটেনিং কন্ডিশন। আই-ম ট্রাইং টু প্রোটেক্ট হিজ লাইফ। প্লিজ ডোন্ট এভার টক টু মি এগেইন। জবাবে আমি বললাম।

সাইড লাইং এ শোয়ানোর পর চট করে অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৩৬ থেকে ৮৮ তে উঠে গেলো। দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ওহ গড, বেটার দ্যান পাস্ট!!

কর্তব্যরত পুলিশ কন্ট্রোলে কথা বললো(নতুন পেশেন্ট আসলে কন্ট্রোলে ইনফর্ম করতে হয়)। পেশেন্টকে কোথায় নিবে সেটা জানতে চাইলো। আমি ইশারায় পুলিশকে (কন্সটেবল) ডাকলাম। বললাম আইসিইউ তে কথা বলেন। বেড খালি আছে কিনা খবর নেন। তার আগে একটা ফেইস মাস্ক এরেঞ্জ করেন। মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো পুলিশ। মুখের সামনে ওয়াকি-টকি (ওয়্যারলেস) নিয়ে,
“গল্ফ ওয়ান টু ইকো টু”
“ইকো টু ক্লিয়ার‍” ওপাশ থেকে জবাব এলো।
“আইসিইউ তে বেড খালি আছে? থাকলে একটা বেড রেডি করেন।”
“জ্বি আছে। রেডি করতে বলছি। ওভার”
“অক্সিজেন সিলিন্ডার সহ পাঠাবেন”……….. বলতে বলতে পুলিশ ভাই সামনে এগিয়ে গেলো।

মিনিট খানেক পর একটা স্ট্রেচার নিয়ে ওয়ার্ড বয় এলো। পুলিশ এসে, “স্যার নেন ফেইস মাস্ক”। তারপরই মামুন ভাই এলেন। মামুন ভাই এইসডিইউ এ-র দায়িত্বে আছেন। ভালো মানুষ। আমারও পছন্দের মানুষ তিনি। মামুন ভাই বললেন, ” ফয়সাল ভাই পেশেন্ট কই নিবেন, এইসডিইউ তে?, “বললাম, না, আইসিইউতে। ”

লিফটের সামনে নিতেই পেশেন্ট কার্ডিয়াক এরেস্ট এ গেলো। তারমানে, শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ, হার্টবিট বন্ধ। মুখ দিয়ে রক্ত মিশ্রিত ফ্লুইড বের হতে লাগলো। নিথর তাকিয়ে আছে পেশেন্ট।

তোর বাবা আর নাই রে……… আর্তনাদ কানে এলো। তারপর একসাথে সবাই কান্নাকাটি শুরু করে দিলো।

শুধু একবার বললাম, মামুন ভাই সিপিআর (CPR= Cardio Pulmonary Resuscitation) ….(বুকের মাঝখানে স্টার্নামের ঠিক শেষ অংশে এক হাত অপর হাতের উপর রেখে ফুল বডি ওয়েটে নির্দিষ্ট নিয়মে চাপ দেয়াকে সিপিআর বলে। এর মাধমে থেমে যাওয়া হার্ট পূনরায় পাম্প করতে শুরু করে। এবং পালমোনারি অর্থাৎ লাংসও পূনরায় শ্বাস-প্রশ্বাস চালু করে দিয়ে চলতে থাকে।)

শরীরের যত শক্তি আছে সবটুকু দিয়ে সিপিআর দিতে লাগলাম। ছাব্বিশ বার চাপ দেয়ার পর পেশেন্ট একবার জোরে শ্বাস নিয়ে উঠলো। ত্রিশটা চাপ দিয়ে তিন সেকেন্ড থামলাম। তারপর আবার। এভাবে চলতে লাগলো। তারপর আইসিইউ তে নিলাম পেশেন্ট।

আরো অনেক পদ্ধতি অবলম্বন করে শেষ পর্যন্ত পেশেন্ট এর হার্টবিট চালু করলাম। তিনি বেচে আছেন। সোজাসাপটা যদি বলি তবে বলতে হয় পূনরায় ফিরে এসেছেন।

আরও যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছি তাকে ফেরাতে, আজ তার সব বলবো না। সময় নেই। তাছাড়া এত বড় লেখা কেউ পড়তেও চায় না আজকাল। কারো শুনতে ইচ্ছা হলে আমাকে বইলেন। বাকিটা বলব তখন।

ডাক্তার, নার্স, আরটি(রেস্পিরেটরি থেরাপিস্ট), পুলিশ, ওয়ার্ড-বয়, আয়া আমরা সবাই মিলে একটা টিম। একটা পরিবার। আমরা জীবন বাচানোর কাজে সিলেক্ট হয়েছি সৃষ্টিকর্তার লিস্টে। এই টিমের সবারই সমান গুরুত্ব ছিলো পেশেন্টটাকে ফিরিয়ে আনার কাজে। তার হার্টবিট পূণরায় চালু করার জন্য। এমন হাজরটা পেশেন্টকে আমাদের হাত ধরে ফিরিয়ে দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা। আজকের পেশেন্টকেও ফিরিয়ে দিয়েছেন আমাদের হাত ধরিয়ে দিয়ে।

শুধু ফার্স্ট এইড টা আমি দিয়েছি।

সুপারম্যান নই।
আমি নার্সিং কর্মকর্তা।
জীবন বাচানোর এ জার্নিতে আমার এতটুকু অবসর নেই।

ফয়সাল ফারাবী
সিনিয়র নার্সিং কর্মকর্তা কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল, ঢাকা।