• আজঃ শনিবার, ১৪ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৮শে নভেম্বর, ২০২০ ইং

আন্টি বিশ্বাস করেন, এ বাচ্চা আমার না-ফয়সাল ফারাবী

আমি মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে বললাম। আন্টি বিশ্বাস করেন, এ বাচ্চা আমার না,বাচ্চার বাবার কাজ বাচ্চার বাবাই করেছে। সেও আবার অনেকদিন আগে। এই ধরেন ৮ মাস আগে। আর আজ যে কাজটা করেছি, সেটা আমার কাজ। শুধুমাত্র ডেলিভারি করেছি। একটা মিডওয়াইফ মেয়ে সব শুনেছিলো আড়ি পেতে। সবাইকে বলে দিয়েছিলো।

ভাইয়ের সাথে কিছুক্ষণ
-আমি সাদিকুল ইসলাম
ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি (৩য় বর্ষ)
নার্সিং ইন্সটিটিউট, কুমিল্লা
-ফয়সাল ফারাবি
নার্সিং অফিসার
কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল, রাজারবাগ, ঢাকা।

– ভাই Ashraful Alam ভাই ছাড়া আপনার আর কোনো বেস্টফ্রেন্ড আছে?
– শুরুতেই কনফিউজড করে দিতে চাইছিস। এটা কোনো প্রশ্ন হলো? অন্য প্রশ্ন কর।
– ভাই, বলেন প্লিজ! আমি লক্ষ্য করেছি, বেস্ট ফ্রেন্ড এর প্রসঙ্গে ডিসকাশন হলে আপনি আশরাফুল ভাইএর কথা একটানা বলে যেতে থাকেন।
– এটা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বলার মতো কোনো প্রসঙ্গ নয়। তুই বড্ড অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করিস।
আচ্ছা, জানতে চাইলি যেহেতু, বলি। শোন, বেস্টফ্রেন্ড একাধিক থাকতে পারে। আমারও অনেকগুলো বেস্টফ্রেন্ড আছে। তবে সেটা বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে।
– ভাই, একটু পরিস্কার করে বলেন।
– গ্রেডিং সিস্টেম বুঝিস তো।
– জ্বি ভাই।
– আমার নিজের জন্য নিজের বানানো কিছু রুল্স আছে। সেগুলো শুধুমাত্র নিজের ক্ষেত্রেই এপ্লাই করি।
যাইহোক, সেই রুন্সগুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে, আমি সবাইকেই এক ক্যাটাগরিতে ফেলি না। বিভিন্ন গ্রেডে ভাগ করি। গ্রেড A, গ্রেড B, C, D। সেখানে আশরাফ বরাবরই গ্রেড A তে পড়ে। ওর স্থানে বা আশেপাশে অন্য কেউ এখনো আসতে পারেনি। ওর বিশেষ কিছু এক্সট্রা অর্ডিনারি গুণ আছে। যা অন্য সবার মাঝে এভেইলএবল না। এরকম বিশেষ বিশেষ কিছু কারণে বরাবরই ও আমার কাছে অন্যতম। তবে আমার বাকি বেস্টফ্রেন্ডরাও আমার কাছে অমূল্য।

– ভাই, আপনি অনেক গুছিয়ে কথা বলতে পারেন। আমি পারবো কিভাবে?
– এটা খুবই সহজ একটা ইস্যু। নিজেকে গোছানোর নিয়মের যে ডায়েরি। এটা তার প্রথম পৃষ্ঠাতেই আছে। তাছাড়া যা তা বলে না ফেলা এবং কথা বলার সময় গুণগত এক্সপ্রেশন ও এট্টিটিউড গুছিয়ে কথা বলতে বিশেষ সহায়তা করে। তবে যা কিছু বলতে হবে তা হতে হবে তথ্যবহুল এবং সাব্জেক্টিভ এবং সহজ ও সাবলীল। বঙ্কিমচন্দ্র তার রচনার শিল্পগুণ প্রবন্ধে বলেছিলেন, ” বক্তা যাহা বলিলো শ্রোতা তাহা বুঝিলো না, এখানে বক্তার বক্তব্যই বৃথা হইলো।” আমি এই লাইনটি মনে রেখেছি।
বিএসএমএমইউ তে মৌখিক পরিক্ষা দিয়েছিলাম, ম্যাডাম বলেছিলেন, ” না না দেখেন ছেলেটা কি সুন্দর গুছিয়ে কথা বলতে পারে!!!”
গুছিয়ে যে কথা বলতে পারি সেটা সেদিনই প্রথম মনে হলো।

– ভাই, প্রফেশনের জন্য আপনি একজন রোল মডেল। দেশের প্রায় সব ইন্সটিটিউটের স্টুডেন্ট আপনাকে ফলো করে।
– রোল মডেল বেপারটা অনেক বড় একটা কথা। নানামুখী গুণের অধিকারী হওয়া লাগে তার জন্য। আমার চেয়ে অনেক বড় বড় ব্যাক্তিত্ব আছেন। যাদের তুলনায় আমি বড্ড বেশি কাঁচা। আমার মনে হয় যারা আমাকে ফলো করে, তাদের উচিত হবে আরও বেশি এনালাইসিস করা এ বেপারে।
– প্রতিকূল পরিবেশের ভিতর দিয়ে অনেক কম সময়ে আপনার এই পজিশনে আসার মূলমন্ত্র কি? বলতে চাইছি, লাইফে অনেক স্ট্রাগল করেছেন। মানবসৃষ্ট বিভিন্ন দূর্যোগে আপনি সটান দাঁড়িয়ে। কোনোসময় হেলে পড়েননি। কিভাবে?
-এত কিছু জানলি কিভাবে? বাহ! তুই তো ছোটখাটো বেপারেও বেশ আগ্রহী!
আচ্ছা শোন, প্রতিকূল পরিবেশের ভিতর দিয়ে আমাকে বড় হতে হয়েছে। এটা বড় ধরণের সত্য কথা। এসএসসি পাশ করার পর একটা বেশ বড়সড় ব্যারিয়ার এর মুখে পড়েছিলাম। পড়ালেখার পর্ব তখনই শেষ হয়ে যেতে পারতো। নির্দিষ্ট রুটে বিমান চালাতে হয়। মাত্র এক ডিগ্রী এ্যাংগেলে চললে বিমানকে গন্তব্য থেকে অনেক দূরে গিয়ে ল্যান্ড করতে হয়।

আমি আমার লক্ষ্য থেকে এক ডিগ্রিও মুভ করিনি।
শ্রদ্ধেয় প্রিন্সিপাল Kabir Uddin স্যার আমাকে তার কলেজে ফ্রি পড়াশোনা করার ব্যাবস্থা করে দেন। তিনি নিজে আমাদের বাড়িতে এসে আমাকে এ অফার দিয়েছিলেন। ইন্টার পড়াকালীন সময়ে সার্বিক সহযোগিতা আমি স্যারের কাছ থেকে পাই। কোচিং করিনি কোনোদিন। ফ্যামিলির ভরণপোষণের দায়িত্ব তখন আমাদের দু ভাইয়ের উপর ছিলো। আমি আর আমার ছোটভাই। ২০১৪ সালে জিপিএ ৫ পেয়ে এইসএসসি পাশ করে বের হই।
আম্মু কলেজের সবাইকে মিষ্টিমুখ করিয়েছিলো।

তবে নার্সিং পড়ার সময় সবচেয়ে বেশি কষ্ট করতে হয়েছিলো। নার্সিং স্টুডেন্ট থাকাকালীন সময়ের ঘাত-প্রতিঘাত গুলোই আমার সমস্ত জীবনের মূলধন। এই তিন বছরে ঘটে যাওয়া প্রতিটি দিনের কথা আমার মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস সংরক্ষণ করে রেখেছে। সুতরাং এগুলো কোনোদিন ভুলে যাবো না। Shabbir Ahmed Khan Nayan স্যার ছিলেন আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। চেষ্টা করতাম তার কোনো ক্লাস মিস না করার জন্য। মুগ্ধ হয়ে স্যারের লেকচার শুনতাম। তাঁর কথাগুলো অনেক বেশি অনুপ্রেরণামূলক। আল্লাহ তাকে আর্টিফিশিয়াল কোনো মেমোরি দিয়ে গুণান্বিত করেছেন মনে হয়। স্যারের নামে উল্টাপাল্টা কিছু শুনলে আমার গা জ্বালা করতো। প্রতিবাদ করতাম। তারাই আবার স্যারের কাছে প্রিয় হওয়ার চেষ্টায় সদা জাগ্রত।

– একাধারে সর্বোত্তম পর্যায়ের পড়াশোনা, কর্মক্ষেত্রের চমৎকার সফলতার প্রতিচ্ছবি , মানবসেবা এবং অসাধারণ ব্যাক্তিত্বের অধিকারী আপনি। এর রহস্য কি?
-পড়াশোনার খরচ বহনের জন্য প্রথম থেকেই কর্মজীবী হতে হয়েছে আমার। নিয়মিত সেমিস্টার ফি পরিশোধ করতে পারিনি কোনোদিন। সেমিস্টার ফি পরিশোধ করা স্টুডেন্টদের বই, খাতা, কলম দেয়া হতো।
আমি সবসময় ফটোকপি পড়তাম। আর গুগল তো আছেই। সাথে সবসময় নোট রাখতাম। কাজের ফাকে পড়তাম। পরিক্ষার রেজাল্ট তাই মনের মতোই হতো। প্রথম সেমিস্টার থেকেই জব করার দরুন কর্মক্ষেত্রে আমার আলাদা একটা অভিজ্ঞতা আছে। তাছাড়া আমি কাজে খুবই মনোযোগী। জানার আগ্রহ আমাকে ঘুমোতে দেয় না।

-মানবসেবা মহৎ গুন। প্রফেশনাল রেস্পন্সিবিলিটির জায়গা থেকে নয়, সবসময় বাই হার্ট সেবা দেয়ার চেষ্টা করেছি। ফলস্বরূপ অবশ্য মাঝে মাঝে না খেয়ে থাকতে হয়েছে, কখনো আবার ডিউটি শেষ করে পায়ে হেটে বাসায় ফিরতে হয়েছে। শারিরীক কষ্ট হতো, তবে মানষিকভাবে তৃপ্তি পেতাম।
-নিজের পার্সোনালিটি নিয়ে আমার তেমন কোনো আইডিয়া নেই। নিজেকে সময় দিতে পারিনা খুব একটা। লোকে বলে আমার পার্সোনালিটি ভালো, তাই শুনি। তবে আমি বেশ প্রতিবাদি এবং স্পষ্টভাষী। তাই আমাকে অপছন্দ করে এমন লোকও আছে ঢের। বাট, রিয়েলি দ্যাট ইজ নট মাই কনসার্ন। আমি চলার পথে থেমে যাবনা সামান্য এই বেপারে।
– ভাই নার্সিং এর রাজনীতির বেপারে বলেন।
– নার্সিং এ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আমাকে সবাই চিনবে এটা আমি চাইবোনা। এ ধরণের রাজনীতির বেপারে আমার কোনো আগ্রহ নেই। স্কীল ডেভেলপমেন্ট এর চিন্তায় আমার চুল পেকে যায়। রাজনীতি নিয়ে ভাববো কোন সময়। তবে নার্সিং এর যে সংগঠন গুলো আছে সেগুলোর ভাইটাল পদে কারা আছে সেদিকে কর্তৃপক্ষের নজরদারি জরুরী। অন্যথায় সর্বনিম্ন মানের রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে এগুলো খেতাব পেয়ে যাবে।
মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা এবং শেখ রাসেল কে নিয়ে আমার অনেক কৌতূহল। আমি তাদেরকে ভালভাবে জানতে চাই। বঙ্গবন্ধু পরিবারের মধ্যে রাসেলকে আমার সবচেয়ে বেশি ভালোলাগে। কি নিষ্পাপ চাহনি তাই না? বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে।

– ভাই মজার একটা ঘটনা বলেন।
-অনেক আছে মজার ঘটনা। একটা বলি। আমি ২০০ প্লাস নরমাল ডেলিভারি করেছি। ঢাকা মেডিকেলের লেবার(গাইনী) ওয়ার্ডে একটা পেশেন্ট এসেছিলো সেদিন। ডায়াগনোসিসঃ SPE with 2nd gravida with 1st NVD with PRoM with breech presentation.
আমি ডেলিভারি করেছিলাম। বাচ্চা এবং মা দুজনই আল্লাহর রহমতে ভালো ছিলো।
লেবার ওয়ার্ড থেকে বের হতেই এক আন্টি( ৬০ এর বেশি বয়স হবে) দৌড়ে এলেন। ” ও ছার, মাথাডা এট্টু নোয়ান। দুইটা ফু দিয়া দেই। আল্লাহ আপনেরে বালা রাহুক। আপনার মা রত্নগর্ভা। আপনার মাকেও আল্লাহ ভালা রাহুক। বাইচ্ছা তাহুক আপনার মা, বাইচ্চা তাহুইন আপ্নে।………!!?? ”
আন্টি কি হয়েছে? এমন করছেন কেনো? প্রশ্ন করলাম।

আপ্নে আইজকা আমার নাতির বাপের কাম করচুইন। আপ্নের জন্যোই আইজক্যা হেই দুনিয়ার মুখ দ্যাকলো।!!!!
আমি মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে বললাম। আন্টি বিশ্বাস করেন, এ বাচ্চা আমার না।বাচ্চার বাবার কাজ বাচ্চার বাবাই করেছে। সেও আবার অনেকদিন আগে। এই ধরেন ৮ মাস আগে। আর আজ যে কাজটা করেছি, সেটা আমার কাজ। শুধুমাত্র ডেলিভারি করেছি।
আমাকে যেটা বলেছেন ওটা বাচ্চার বাবাকে গিয়ে বইলেন একটা মিডওয়াইফ মেয়ে সব শুনেছিলো আড়ি পেতে। সবাইকে বলে দিয়েছিলো। তারপর থেকে আপুরা আমাকে ক্ষেপাতেন। আর বন্ধুরা তো সুযোগ পেলেই বারোটা বাজিয়ে দিতো
– আপনার প্রিয় ফিল্ম কোনটা ভাই?
– একটা না। অনেকটা। হাংর নদী গ্রেনেড, আমার বন্ধু রাশেদ, শ্রাবণ মেঘের দিন, হাজার বছর ধরে, নুরু মিয়া ও তার বিউটি ড্রাইভার। আরও আছে।
-ছোটদের জন্য আপনার উপদেশ বা নির্দেশ কি ভাই?

 দুটি কথা
১। সবচেয়ে মূল্যবান ধাতু হলো ডায়মন্ড। এবং এটা কয়লার ক্ষণিতে পাওয়া যায়। বলতে চাইছি, বড় জায়গায় থেকেই বড় হওয়া যায়না, উঁচু হওয়া যায় হয়তো। বড় হতে হবে। এজন্য গায়ে কাদা ধুলো লেগে গেলেও ক্ষতি কি যদি অমূল্য কিছু হয়ে আত্মপ্রকাশ করা যায়!
২। সবচেয়ে মূল্যবান ধাতু ডায়মন্ড। কিন্তু ভূপৃষ্ঠের সবচেয়ে ধারালো জিনিস এটা। নিজের দ্বারা যাতে তাই অন্য কারো ক্ষতি হয়ে না যায় সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। মীর মশাররফ হোসেন এর “বিষাদ সিন্ধু” পড়েছিলাম। এজিদের চক্রান্তের বশবর্তী হয়ে হযরত ইমাম হাসান (রা) কে তার দ্বিতীয় স্ত্রী জায়েদা কর্তৃক পানির সাথে জহরত(ডায়মন্ড) খাইয়ে প্রাণ নাশের ঘটনায় ডায়মন্ড এর ভয়াবহতার বিস্তর বর্ননা পাওয়া যায়।

-অবসরে কি করেন ভাই?
– সত্যি বলতে আমার তেমন কোনো অবসর সময় নেই। বিভিন্ন কাজে ব্যাস্ত থাকতে হয়। বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন অফার আসে। না করে দিতে হয়।
-তারপরও যদি এতটুকু অবসর পাই, তখন হাঁটি। গন্তব্যহীন পথে হাঁটি। একা হাটি। নিজেকে সময় দেয়ার চেষ্টা করি। চারিদিকে কি ঘটছে তা পর্যবেক্ষণ করি।
– ভাই আপনার মতো হওয়ার চেষ্টায় আছি।
– এটা তোর জন্য কতটুকু ফলপ্রসূ হবে? আমাকে ফলো করবি না, তা বলছি না। সবার কাছ থেকেই শিখতে হয়। আরও অনেক বড় বড় ব্যাক্তিত্ব আছে তাদেরকেও ফলো কর। তবে শিখতে চাইলে রিকশাওয়ালার কাছ থেকেও শেখার আছে।
-আপনার প্রিয় শখ কি ভাই?
– সুযোগ পেলেই তাহাজ্জুদ পড়ি। ফজরের নামাজ জামাতে পড়ি। কোরআন শরিফ নির্ভুলভাবে অর্থসহ মুখস্থ বলা আমার শখ। চেষ্টায় আছি।


সাদিকুল ইসলাম
ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি (৩য় বর্ষ) , নার্সিং ইন্সটিটিউট, কুমিল্লা
ফয়সাল ফারাবি
নার্সিং অফিসার , কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল, রাজারবাগ, ঢাকা