• আজঃ শুক্রবার, ১৩ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৭শে নভেম্বর, ২০২০ ইং

যদি মেয়ে চাকরি করা বাদ দিতে পারে তবেই মেয়েকে বউ করে নিয়ে যাবো

পাত্রপক্ষের সামনে বসতেই ছেলের মা আমাকে প্রশ্ন করলেন,বিয়ের পরে চাকরি বাকরি করার ইচ্ছে আছে নাকি? আমি কিছু বলার আগেই বাবা বলল,ইয়ে মানে শ্বশুড়বাড়ির মানুষ যদি না চায় তবে করবে না চাকরি।এটা আর এমন কি ব্যাপার।

বাবার কথাবার্তা শুনে একটুও অবাক হচ্ছি না।প্রত্যেক বারই বাবা পাত্রপক্ষকে এসব কথা বলে যেনো বিয়েটা ভেঙ্গে না যায়।অথচ এই চাকরিটা জোগার করতে আমাকে কতটা কষ্ট করতে হয়েছিলো সেটা শুধু আমিই জানি।এরপর ভদ্র মহিলা আমাকে আবারও প্রশ্ন করলেন,তা তোমার কোনো বড় ভাইটাই নেই? আমি মাথা নাড়িয়ে না বললাম।

ভদ্র মহিলা ছেলের বাবার দিকে তাকিয়ে বিরবির করে কি সব যেনো বললেন।তারপর বাবাকে বললেন,একেই তো আপনাদের কোনো ছেলে নেই আর তার উপর মেয়ে বিয়ের পরেও চাকরি করবে।বলি ভবিষ্যতে তো আপনাদের মেয়েকেই তাহলে আপনাদের টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করতে হবে।আর আমার বাড়ির বউরা তাদের বাপের বাড়িতে টাকা পাঠাবে এসব কিছুতেই মেনে নিব না আমি।যদি মেয়ের চাকরি করা বাদ দিতে পারেন তবেই আমরা আপনাদের মেয়েকে বউ করে নিয়ে যাবো।এবার আপনারাই ভেবে দেখুন কি করবেন।

আমি তৎক্ষনাৎ বসা থেকে একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললাম,বেরিয়ে যান।ভদ্র মহিলা আমার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বললেন,কি বললা? কি বললাম বুঝতে পারেন নাই? বেরিয়ে যান আমার বাসা থেকে নয়তো যেটুকু সম্মান পাচ্ছেন সেটুকুও পাবেন না এরপর।

ঐ মহিলা সেদিন সবার সামনে আমাকে অভিশাপ দিয়ে গিয়েছিলো।সে বলেছিলো,আপনার এমন অসভ্য মেয়ের জীবনে কোনোদিন বিয়ে হবে না।এমন মুখে মুখে তর্ক করা মেয়েকে কেউ তাদের বাড়ির বউ করে নিয়ে যাবে না। তিন বছর পর সেই মহিলার সাথে আমার আবার দেখা হয় হাসপাতালে।তিনি হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছিলেন।আমি ওনাকে দেখে কাছে গিয়ে বললাম,কি হয়েছে আপনার?

বেডের পাশে এক মেয়ে বসা ছিলো।সে বলল,মায়ের শরীর ভীষন খারাপ আর এদিকে ডাক্তারের আসার নাম নেই।আমি একা একটা মেয়ে কি করবো না করবো কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি অবাক হয়ে বললাম,আপনাদের বাড়ি থেকে আর কেউ আসেনি? আপনার ভাই?

ভদ্র মহিলা মলিন কন্ঠে বললেন,ছেলের এতো সময় কই আমাকে নিয়ে ভাবার।সে তো তার বউকে নিয়ে নতুন ফ্ল্যাটে উঠেছে।আমি আমার মেয়ের কাছেই থাকি।আমার মেয়েই আমার দেখাশোনা করে।

মহিলার অবস্থা খারাপ দেখে আমি তারাতারি ইফতিকে ডেকে নিয়ে এসে বললাম,এই পেসেন্টকে একটু তারাতারি দেখো তো উনি আমার পরিচিত। ইফতি ওনাকে দেখে চলে যাওয়ার পর ভদ্র মহিলা বললেন,কে মা তুমি? আমাকে কিভাবে চিনলে!

আমি একটা হাসি দিয়ে বললাম,মনে নেই আমাকে?আপনার ছেলের জন্য আমাকে দেখতে গিয়ে আমার বাবাকে বলেছিলেন আমার কখনও বিয়ে হবে না।মনে নেই আপনার! আমার কোনো ভাই নেই বলে আপনি বলেছিলেন বিয়ের পরে আমার বাবা-মাকে দেখতে হবে।সেই ভয়েই তো আপনি সেদিন বিয়েটা ভেঙ্গে দিয়েছিেন।এখন তো দেখছি আপনি আপনার মেয়েকে ছাড়া পুরো অচল। ভদ্র মহিলা আমার হাত দুটো ধরে কেঁদে উঠে বলল,তুমি সেই মেয়ে! ডাক্তার তোমার কি হয় মা?

মৃদু হেসে বললাম, আমার হাসবেন্ড হয় উনি।আর এই হাসপাতালটা আমাদেরই।আর হ্যা আমি এখনো সেই চাকরিটা করছি।শ্বশুর-শাশুড়ির খেয়াল রাখছি আর সাথে নিজের বাবা-মায়েরও।আপনার মেয়েও তো খুব সুন্দর করে আপনার খেয়াল রাখছে।অথচ আপনি ভেবেছিলেন বাবা-মায়েরা বোধহয় শুধু মাত্র ছেলেদের উপরই নির্ভর করে থাকে।মেয়েদের বিয়ে দিয়ে পরের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া মানেই সে দায়মুক্ত হয়ে যায় না।মেয়ে হিসেবে তারও অনেক দায়িত্ব থাকে নিজের বাবা-মায়ের প্রতি।আশা করছি আপনি আপনার সেদিনের ভুলটা বুঝতে পেরেছেন। ভদ্র মহিলা লজ্জায় আর আমার দিকে তাকাতে পারছিলেন না।শেষে সে তার ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাইলেন।
লিখেছেনঃ©Zannatul Eva