• আজঃ সোমবার, ১৯শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩রা আগস্ট, ২০২০ ইং, ১৪ই জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী

গল্প: পথের পথিকঃ পর্ব – ৩

আয়শা মুমিনঃ

দ্বিতীয় পর্বের পর থেকে
চারদিকে সন্ধা নামে।মনু বিদায় জানায় মরা নদীকে। জুলেখা সারা পাড়া ঘুরে ঘুরে অস্থির।ছেলেটা কোথায় গেলো? বৃষ্টি হলো অথচ ছেলে ঘরে এলো না। এখন রাতের অন্ধকার পৃথিবী দখল করছে তবুও ছেলের বাড়ি ফেরার নাম নেই।মনুর মন খারাপ।ধীর পায়ে হেটে নদীর ধার থেকে এই পর্যন্ত এসেছে।

ততক্ষণে অন্ধকার অনেক ঘারো হয়ে গেছে। পুরনো তেতুল গাছটার নিচে মূর্তির মতো কে যেনো দাড়িয়ে আছে।
মুখ দেখা না গেলেও ছাঁয়া দেখা যচ্ছে স্পষ্ট। মনু দেখলো তার মা জুলেখা দাড়িয়ে আছে।

:মনু,ও মনু। কনে ছিলি তুই বাজান? মার লগে গোস্সা করিছিস?
:মা,তুমি এ অন্ধকারে বের হইছো ক্যান? আমি তোমার লগে গোস্সা করে থাকতে পারুম?
:সারা দিন কিছু খাস নাই।মুখখানা কেমন শুকাই গেছে!আয়,বাড়ী চল। চল। মনু মায়ের সাথে বাড়ী যায়।জুলেখা ছেলেকে খেতে দেয়।
:মা,সালুন কী পাকাইছো আজ?
:শুটকি মাছ দিয়া লাউয়ের ডগা।
:প্রত্যেক দিন একই খাবার খেতে ভাল্লাগে না মা।
:কি করুম বাজান?গরিব মাইনষে এগুলান খাতি হয়। মনু মায়ের দিকে তাকায়।মা বলেন,

:খাইয়া ল বাজান।কাল ভালা মন্দ কিছু পাকাইমু।খাইয়া ল।

খাওয়া শেষে মনু শুয়ে পড়ে।জুলেখা ছেড়া কাঁথা দিয়ে ছেলের শরীর জড়িয়ে দেয়।ঘরের কোণে মিঠ মিঠ করে আলো জ্বলে।জুলেখা ল্যামটনের আলো কমিয়ে দেয়। কেরোসিন প্রায় শেষ।কাল রাত কিভাবে কাটাবে এই ভাবনা করে। মনুর শিওরের কাছে বসে জীবনের অঙ্ক কষে।কিছুতেই হিসেব মিলে না তার।

কখনো তাকে শৈশবের স্মৃথী আকড়ে ধরে,কখনো ভবিষ্যতের চিন্তা। তার মনে পড়ে,সখিদের সাথে কলসী নিয়ে নদীতে যেতো ।জাল নিয়ে জোয়ান ছেলেটা আসতো মাছ ধরতে। মাছ ধরার আদলে সে জুলেখাকেই দেখতো।কালো গায়ের রং,মাথায় ঠাসা চুল ভেরার লোমের মতো কুকড়ানো। উদলা শরীরে তেলতেলে ভাব ।

গলায় ঝুলানো তাবিজ। জুলেখা তখন পাড়ার সুন্দরীদের মধ্যে একজন। গায়ের রং দুধে আলতা ছিলো। সে কি লজ্জা ছিলো তার তখন।এ দেখে কালো জোয়ান ছেলেটা মুচকি হাসতো। জুলেখাও হাসতো শুধু। কি করে যেনো এই ভাব বিনিময়টা জুলেখার সৎ মায়ের কানে পৌছে যায় সে জানে না।

মাঝ বয়সী হারুন মিয়ার সাথে তার বিয়ে দেওয়া হয় তাড়াহুড়া করে। বিয়ের সময় জুলেখার বয়স ছিলো ষোল বছর। যখন একটা কিশোরীর হৈ-হুল্লোর করে ঘুরে বেড়ানোর কথা তখন তাকে সংসার নামের বেড়াজালে আটকে দেয়া হয়। চব্বিশ বছর বয়সে স্বামীকে হারিয়ে বিধবা হতে হয় ।

এ গ্রামের পূর্ব মাথায় দাড়ালে তার বাবার বাড়ীটা দেখা যায়।আহা! ঐ দূরে ছাঁয়ার মতো গ্রামটা তার কতো আপন ছিলো। এখন সে গ্রামটা অচেনা হয়ে গেছে। বাবা সংগ্রামের সময় সৎ মা আর ছোট ভাইটাকে নিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলো আর ফিরে আসে নি।শূণ্য ভিটা পড়ে আছে ।

ল্যামটনের আগুন ধীরে ধীরে নিভে যায়। মূহুর্তেই শৈশবের ভাবনা তাকে ছেরে দেয়। ঘারো অন্ধকার ঘরে। মনু গভীর ঘুমে মগ্ন ।ভাঙা ভেরার ফাঁক দিয়ে জোঁছনার আলো ঘরে পড়ে। আস্ত একটুকরো চাঁদ উঁকি দেয় তার ভাঙা ঘরের ভেতর। নাহ!অন্ধকারে বসে থাকতে আর ভালো লাগে না।

দরজার খিল খুলে বাইরে বের হয়ে আসে সে। চাঁদ দেখে,তারা দেখে। ভাবে,ঐ চাঁদ তারাগুলোর কতো সুখ। কতো সুখে তারাগুলো জ্বলে আর নিভে।জুরে নিশ্বাস ছাড়তে ইচ্ছে করে তার। লম্বা করে শ্বাস টান দেয়।ঠাণ্ডা বাতাস ভেতরে ডুকে বুকের জ্বালা নিভিয়ে দেয় অল্প সময়ের জন্য। প্রশান্তির স্পর্শ লাগে মনে ।

তখন বাঁচতে ইচ্ছে করে।তখন পৃথিবীটা ভালো লাগে। উঠোনে দাড়িয়ে প্রাণ ভরে শ্বাস নেয় সে। ভেজা বাতাসে পেঁচার শরীরের গন্ধ নাকে ভেসে আসে। দূর হতে কুকুরের কান্নাও ভেসে আসে কানে। গভীর রাতের সাথে কুকুরের কান্নার এতো নিবীড় সম্পর্ক!কুকুর কান্না করলে রাত কেমন বিষাদময় হয়ে উঠে ।

আবার রাত গভীর না হলে কুকুরের কান্না শুনতে ভালো লাগে না। ভয়ঙ্কর হওয়া রাতের ধর্ম। কুকুরের কান্নার সুর না পেলে রাত ভয়ঙ্কর হয় না। নাহ,রাত ভীষন্ন হয়ে পড়েছে। ভীষন্নতা তার একটুও ভালো লাগে না। কুকুরের কান্না জীবনের কষ্টের কথা মনে করিয়ে দেয় । (সমাপ্ত)


ফেসবুকে লাইক দিন