• আজঃ সোমবার, ১৯শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩রা আগস্ট, ২০২০ ইং, ১৪ই জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী

গল্প: পথের পথিকঃ পর্ব – ২

আয়শা মুমিনঃ


প্রথম পর্বের পর-
ওহ! খিদে লাগছে খুব।তার আর ভালো লাগছে না এসব ভাবতে।সে ভাবতেও চায় না।এসব মনে করতে চায় না সে।তার খারাপ লাগে।তবু মনে পড়ে।নাহ্,আর ভাববে না সংকল্প করে।খিদে লেগেছে।বাড়িতে গেলে মা হয়তো কিছু খেতে দেবে।পেট ভরে খাবে সে।তারপর আরাম কর এক পষলা ঘুম দেবে।

বাশের সাঁকু পেরিয়ে বাড়ির দিকে হাটে সে।মা রসুই চালার নিচে চালার তনির সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে।কি ভাবছে কে জানে!চোখ দুটো জলে ভরা।জল চোখের ভেতরেই টলমল করছে।কিন্তু গড়াচ্ছে না।যন্ত্রণা পেতে পেতে হয়তো চোখের জলও ধৈর্য় ধরা শিখে গেছে।তাই চোখের জল আর মাটিতে গড়ায় না।চোখেই আটকে থাকে।জীবন এতো নিঠুর!

এক জীবনে এতো কষ্ট আর কতো সহ্য করা যায়!মনুর বাপ মরে গিয়ে মুক্তি পেয়েছে জীবনের এই কঠিন যন্ত্রণা থেকে।সংসারের বেড়াজালে মনুর মাকে ঠেলে দিয়ে সে পালিয়েছে জীবন ছেড়ে।আর সহ্য হয় না তার।ইচ্ছে করে গলায় দড়ি দিয়ে মরে যেতে।মনুর জন্য দড়ি দেওয়ার কথা বাদ দিয়েছে।

সে মরে গেলে ছেলেটার কি হবে।নাহ্,মরে যাওয়া চেয়ে পুড়তে পুড়তে বেঁচে থাকা ভালো।এর নামই জীবন।তবু মাঝে মাঝে অস্থির হয়ে উঠে।কষ্ট যখন সহ্যের বাইরে তখন নিজেকে সামলাতে পারে না।গত চৈত্রে কড়া সুদে ঋণ এনেছিলো পাটুয়ারির কাছ থেকে।বৃষ্টি না হওয়ার ফলে এক মুঠো ফসলও সে পায় নি।

খেয়ে পড়ে বাঁচবে কি করে।তার উপরে আবার সুদ সহ ঋণ।পাটুয়ারি কদিন পরপর এসে টাকার জন্য তাগিদ দিয়ে যায়।কড়া কড়া কথা শুনিয়ে যায়।গালাগালি করে।জুলেখার আর সহ্য হয় না।সে ভাবে,ভাবতে থাকে।
: মা খাতি দাও,খিদা লাগছে।
: আমায় খেয়ে ফেল।আর কি আছে খাবার?আমায় খেয়ে শান্তি হয়ে যা।বাপেতো মইরা গিয়া পলাইছে।আমায় ফাঁসির দড়িতে ঝুলাই তই গেছে।এমন কপাল লই তুই জন্মেছিস ক্যান? মরতে পারিস না কোথাও যেয়ে?

মনু বুঝে,আজ পাটুয়ারি এসেছিলো। খানিক পর জুলেখা তালায় করে পান্তা নিয়ে এসে মনুর দিকে ছুরে মারে।মনু উঠনো মূর্তির মতো দাড়িয়ে আছে।ভাতগুলো সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে।গড়াতে গড়াতে তালাটা মনুর পায়ের কাছে গিয়ে থামলো।মনু কিছু বলে না।বলার ভাষা খুঁজে পায় না।

সে হাটা শুরু করে।গ্রামে পুরনো একটা পুকুর আছে।অনেক বড়।বিশাল এই পুকুরটা কে কবে খুড়েছিলো কেউ জানে না।বাবা বলেছিলেন,দেও-দানবরা নাকি এটা খুড়েছিলো।এসবে মনুর ভয় নাই।যে ক্ষিদার ভয়কে জয় করেছে,পৃথিবীর আর কিছুকেই সে ভয় করে না।মনু সিড়িতে বসে পরে।

জীবনের ভাবনা এসে তাকে গ্রাস করে।ভাবনা ছেড়ে সে হাটতে থাকে।কখন যে সেই পরিচিত নদীটার ধারে চলে এসেছে বোঝতে পারে না। নদী শুকনো।নদীর তলায় সামান্য পানি জমে আছে।এটাই বোধ হয় নদীটির শেষ সম্বল। পানির পরিমান এতো সামান্য যে,পা নামালে হয়তো পায়ের মোড়ালি পর্যন্ত ভিজবে,তার বেশি না।

পানি না থাকলে শীতকালে এই কাদা নিয়েই নদীকে বেচে থাকতে হয়।আর টাকা কড়ি না থাকলে মানুষকে কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়।কাদা ভরা বুক নিয়ে নদী বেঁচে আছে।খেঁয়া নৌকাগুলো কাদার উপড়েই পড়ে আছে।পানি শূন্য নদীতে নৌকা দেখলে মনে হয় নৌকাগুলো মাটিতে জড় দিয়ে ফেলেছে শালুকের মতো।

তক্তাগুলো শুকনো,রুক্ষ।নদীর সাথে নৌকাগুলোরও মরমর দশা।অনেক দিন হয়ে গেছে কেউ বৈঠা হাতে নৌকায় উঠে নি।উঠার প্রয়োজন হয় না।ঐ পাশে একটা বান আছে।বর্ষা কালে এ বান দেখা যায় না।পানিতে ডুবে থাকে।শীতকালে নদীর পানি শুকিয়ে গেলে বান জেগে উঠে।মানুষ ঐ দিকেই চলাচল করে।নৌকার প্রয়োজন পড়ে না।

শীত এলে মাঝিদের দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়।কেউ কেউ লোকের ক্ষেতে কাজ করে শীতকাল কাটিয়ে দেয়।তবু দুশ্চিন্তা কাটিয়ে উঠতে পারে না।দুশ্চিন্তা থাকবেই।আজ কাজ পেয়েছে,দুটো পয়সা পাবে।কাল কী করবে? কাজ পাবে কি পাবে না?আরো কতে কি! গরিব মানুষের নানান চিন্তা।অঙ্ক কষে বের করা যাবে না।

বৃষ্টি এলো।ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে,খুব হালকা।বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পড়তে সময় লাগে কিন্তু ফোঁটাগুলো শুষে খেতে মাটির একটুও সময় লাগে না।লাগবে কেমন করে? মাটি বহু দিনের তৃষ্ণার্ত।মাটি,বৃক্ষলতা সবাই প্রতীক্ষায় আছে এক ফোঁটা বৃষ্টির।সবাই ক্ষুদার্থ,সবাই তৃষ্ণায় কাতর।

পৃথিবীর কতো মানুষ এমন ক্ষুদার্থ,এমন তৃষ্ণার্ত।পৃথিবীর আনাচে কানাচে কতো শত মানুষ না খেয়ে বেঁচে আছে।প্রভুর খেলা বুঝা দ্বায়।বাঁচিয়ে যখন রাখবে তাহলে খাবার দেবে না কেনো?খাবার যদি নাই দেবে তাহলে বাঁচিয়ে রাখবে কেনো?
(চলমান)


ফেসবুকে লাইক দিন