• আজঃ সোমবার, ১৯শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩রা আগস্ট, ২০২০ ইং, ১৪ই জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী

গল্প: পথের পথিকঃ পর্ব – ১

আয়শা মুমিনঃ


বিস্তির্ণ মাঠটার পরে সবুজ ক্ষেত দেখা যায়,যতদূর পর্যন্ত চোখ যায়।ভেজা বাতাসের সাথে বেশ আনন্দে মাথা দোলায় ধানের কচি চারাগুলো।কিসের এতো আনন্দ এদের!চারিদিকে মানুষের হাহাকার,ক্ষুধার তৃষ্ণা।ইশ,এই আনন্দটা মানুষের জীবনে নেই কেনো! মানুষের জীবনে এতো কষ্ট কেনো?

ধানের ডগাগুলোর দিকে চেয়ে চেয়ে সে এই কথাগুলো ভাবছে।ধূ ধূ মাঠের মরা ঘাসের উপর বসে আছে সে।তার খানিক দূরে মানুষের কোলাহল।গটগট শব্দ করে ধান ভাঙছে মাড়াই মেশিন।মাড়াই কলের মুখ দিয়ে খড়কোটা বের হয়ে উড়ে গিয়ে দূরে জমা হচ্ছে।মোটমুটি একটা গদি হয়ে গেছে খড়ের।লোকের হৈ চৈ,চেচাঁমেচি।

দুজন ধানের আটিগুলো টেনে নিয়ে মাড়াইকলে দেয়,একজন কাঁচি দিয়ে আটির বান কেঁটে দিয়ে আটিগুলো টেলে মেশিনের ভেতরে ডুকিয়ে দেয়।বাতাসে  হালকা-পাতলা খড়কোটাগুলো অনেক দূর পর্যন্ত উড়ে যায়।যেনো পাখা পেলে তারা উড়ে চলে যেতো কষ্টের পৃথিবী ছেড়ে।আর কখনো ফিরে আসতো না।কিন্তু হায়! তারাও অসহায় মনুর মতো।

পরাশ্রয়ী,বাতাসের উপড় নির্ভর করে তাদের উড়ে চলে যাওয়া,না যাওয়া।বাতাস যেখান পর্যন্ত নিয়ে যাবে,তারা সেখান পর্যন্ত যেতে পারে।এর চেয়ে বেশি যাওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই।মনু ভাবে,পৃথিবীতে কতো অসহায় প্রাণি,অপ্রাণি আছে তার মতো।কতো দুঃখ আছে তাদের মনে!সেই দুঃখ কি তার মতন।নাকি একটু বেশি অথবা একটু কম।

দক্ষিণ দিকটায় ছেলে-ছোকড়ারা খেলা করছে।
চল দাগা….দাগা…..দাগা…..দাগা….!উড়ি পাতা চড়াইয়া,বেটা হলে ধর আইয়া…!
চিৎকার,উল্লাস।কিন্তু কিছুই যেনো মনুর কানে আসছে না।অর্ধেক পথ থেকে বাতাস যেনো ছিনিয়ে নিয়ে যায় সব চিৎকার,সব কোলাহল।মনুর কান পর্যন্ত পৌছায় না।এক এক করে অনেকগুলো ধানের চারায় দৃষ্টি ফেলতে ফেলতে চোখ যখন দূর সীমানায় হারায় তখন বাবার কথা মনে পড়ে।কতো দিন এই সবুজ ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে বাবার জন্য ভাত নিয়ে গেছে।

কতো শালুক কুড়িয়েছে।কচুরি পানার ফুল নিয়ে সেকি ঝগড়া পাড়ার ছেলেদের সাথে।আহা!তার বাবা এখন আর নেই।সে কবে মরে স্বর্গে চলে গেছে অথচ সবুজ মাঠটা এখনো রয়ে গেছে আগের মতোই শান্ত।যেনো একজন মানুষ হারিয়ে গেলে তার কিছু যায় আসে না।পৃথিবীটা এমনই,কেউ হারিয়ে গেলে পৃথিবীর কিছু আসে যায় না।

একদিন গ্রামের লোকেরা এই সবুজ ক্ষেতের মাঝখান থেকে তার বাবার লাশ তুলে নিয়ে আসে।তারপর বাবা আর কথা বলে নি।চোখ বন্ধ করে শুয়েছিলো।মায়ের সেকি কান্না!হাউমাউ করে কেঁদেছিলো।কতো দিন বাবার জন্য ভাত নিয়ে যায় নি।কতো দিন বাবার সাথে জমির আইলে বসে ভাত খাওয়া হয় নি।আহা,সে কি স্বাদ!

ক্ষেতের মাঝখানে কাকতাড়ুয়া দেখে কাকতাড়ুয়ার ভঙ্গিতে দাড়ানোর সে কি চেষ্টা! বাবা বলতেন,মানুষ মরলে কাকতাড়ুয়া হয়ে যায়।বাবা সেই কবে কাকতাড়ুয়া হয়ে গেছে।তাহলে ফসলের মাঠে দাড়িয়ে থাকে না কেনো?সবুজের মাঝখানে এক পায়ে ঠায় দাড়িয়ে থাকাইতো কাকতাড়ুয়ার কাজ।বাবা তাহলে কোন পৃথিবীর কাকতাড়ুয় হলো?

নাহ,তার ভালো লাগে না আর ভাবতে!সে হাটতে থাকে।মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায় কতো শত ভাবনা।হেটে হেটে নদীর ধারে চলে আসে সে।নদীতে চড় জেগেছে।কড়া রোদে ঘাসগুলো জ্বলে পুড়ে চাড়খার।ধূসর বর্ণ হয়ে আছে চড়।তবুও তার ফাকে ফাকে যে দু একটা ঘাস বেঁচে আছে সেগুলো খেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে গরুগুলো।

শুকনো গোবর পড়ে আছে।কোথাও কোথাও শামুকের পরিত্যাক্ত শুকনো খুল পড়ে আছে। ভাঙা সাঁকুটা পার হয়ে হেটে চলে আইল দিয়ে।কতো স্মৃথী জাগে মনে।সামনে বড় কাচা সড়ক।ও পাশে বড় একটা হিজল গাছ।তার ডালপালাগুলো এতো বিস্তির্ণ হয়েছে,বেশ কিছু জায়গা পর্যন্ত তার ছায়া পড়ে।সড়ক পেরিয়ে পুরনো সেই স্কুলটা,টিনের বেড়া,টিনের চালা।

ঐ স্কুলে কতো এসেছে সে।কতো দিন স্কুল পালিয়েছে।সেকি মারামারি,খুনঁসুটি ছেলেদের সাথে।একদিন সে স্কুলে যায় নি।বৈশাখের কড়া রোদ।মাস্টার স্কুল ছুটি দিয়ে বাড়ি যাওয়ার সময় মনুদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন।মনুদের বাড়ির সামনে বিশাল একটা মাঠ।ওখানে গাঁয়ের লোকেরা ধান ভাঙে,ধান শুকায়,খড়কোটা শুকায়,ছেলেরা খেলে,কতো কি!মনু সবার সাথে ধান নাড়তে ব্যাস্ত।

ঐ দূরের পথে এক লোক আসছে ছাতা মাথায়।কড়া রোদে কুকড়া হয়ে আসছে।ঐ লোককে মনু চেনে,ঐ ছাতা তার চেনা।ঐ হাটাও তার চেনা।এই লোক স্কুল মাস্টার।মনু দৌড়ে গিয়ে বাবার হাত ধরে।মনু আজ স্কুল পালিয়েছে।তাই মাস্টারকে দেখে ভয়ে বাবার হাত ধরে।বাবা মনুকে টেনে নিয়ে গেলেন মাস্টার মশাইয়ের সামনে।বললেন,

“দেখেন মাস্টার মশাই,আজ মনু স্কুলে যায় নাই।কতো করে বলছি স্কুলে যাবার কথা,সে যায় নাই”।
মাস্টার মশাই তার চোখ থেকে গোল ফ্রেমের পুরোনো চশমাটা খুলে মনুর মাথায় হাত দিয়ে বললেন,”কেনো বাচা? স্কুলে যাওনি কেনো? স্কুল ফাঁকি দেওয়া ভালো না।কাল থেকে স্কুলে যেও”।
মনু হা সূচক মাথা নাড়ে।বাবা ধমক দিয়ে বলেন,”এই বেয়াদব,মাথা নাড়াস ক্যান?বল,জ্বি,যামু”।
(চলমান)


ফেসবুকে লাইক দিন