লোড বন্ধ করুন
  • আজঃ মঙ্গলবার, ৫ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৮ই জানুয়ারি, ২০২২ ইং

আজ ফাঁকা শহর – আয়েশা মুমিন (পর্ব-১)

“গল্প: আজ ফাঁকা শহর”
আয়েশা মুমিন
( প্রথম পর্ব)


পৃথিবী তার নিজের নিয়মেই চলতে পছন্দ করে। তাই তার গতিপথ ঠেকানোর ক্ষমতা কারো নেই। ( স্রষ্টা ছাড়া) আজ ফাঁকা শহর,ফাঁকা সব। কি একটা ভাইরাস এসে কোনো সাংবিধানিক নিয়ম ছাড়াই পুরো পৃথিবীটাকে ঘর বন্ধি করে রেখেছে। কেউ বেরুচ্ছে না ঘর ছেড়ে। শহরের গলিগুলোতে প্রতিদিন ভালোমন্দ কটা মানুষের আনাগুনা থাকতো। কদিন ধরে তা নেই,মোটেও নেই। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বেরুনো নিষেধ! জায়গায় জায়গায় পোস্টার লাগানো। Stay at home ! Stay at home !

বড় বড় হাইওয়ে রাস্তাগুলো শূণ্য পড়ে আছে।যেখানে এক থেকে দেড় ঘন্টা জ্যামে বসে থাকতে হতো সেখানে আজ গাড়িতো দূরে থাক একটা বাইসাইকেলও নেই। সবকিছু কেমন স্তব্ধ। চেনা শহরটাকে আজ বড় অচেনা লাগছে। অদ্ভুধ ধরণের অচেনা।

আমি আর পারলাম না। নিষেধ অমান্য করে আজ বাইরে বেরোলাম। “সরকার মহাশয়,আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।” আমাদের মতো মানুষকে ঘরে রাখার কোনো আইন নেই। হিমুরা ঘরে থাকে না। হিমু ভাইও নিশ্চই ঘরে বসে নেই। নিশ্চয়ই সে পুরো শহর ঘুরে বেড়াচ্ছে। আজ হিমুর দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা একশোয় একশো। পেলাম না।

নদীর পাড়ে চলে এলাম। কোলাহলপূর্ণ জায়গাটা আজ ভয়ানক জনশূণ্য। কফি কিংবা চা নিয়ে কেউ আর চেচামেচি করছে না। ফুচঁকা ওয়ালা,বাদাম বিক্রেতা কেউ নেই আজ। অন্য দিন এই বিকেলের মধ্যে যে বিসেষ ধরণের ভিষন্নতা দেখা যেতো আজ তাও নেই। আজ বোঝা যাচ্ছে,ভিষন্নতা ছাড়া বিবেলের রূপ পরিপূর্ণ না।

সার্কিট হাউজের সামনে কয়েকজন পুলিশ ঘুরাফেরা করছে। মানুষের কাজইতো ঘুরে বেড়ানো। আমরা সবাই ঘুরে বেড়াই। যদিও একেক জনের ঘুরে বেড়ানোর কারণটা একেক রকম। ভিন্ন ধরনের কারণ থাকতে পারে। মানুষ দেশ থেকে দেশে পুরো পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াচ্ছে কোন না কোন কাজে। অবশ্য এই কদিনের বেলায় ভিন্ন। সব ফ্লাইট বন্ধ। পুরো পৃথিবীতে লকডাউন চলছে।

নদীর বাঁধের রেলিং ধরে ওপাড়ের দিকে তাকালাম। আগে ওখানে লোকজন দেখা না গেলেও আবর্জনার স্তুপে খাবারের সন্ধানে বেড়ানো শুকরগুলো দেখা যেতো,কালো কালো কাকগুলো দেখা যেতো। এরাও হঠাৎ কোথায় চলে গেলো ! করোনা শুধু মানুষের জন্য,পশুদের জন্য নয়। মানুষের ব্যথায় সবাই ব্যাথিত হয়। আমাদের সমবেদনা জানিয়ে পশুরাও লকডাউন পালন করছে।

কমার্স কলেজ পরেই পুঁলিশ লাইন। এ গলিটা বেশ বড়সড়। শুধু মানুষ না। রিকশা,ভ্যান,মোটর বাইক এমনকি দু একটা সি. এন. জি ও চলে। আজ গলিটাও নির্জন। গলির মুখ দিয়ে বেরোলে সামনেই পুঁলিশ ফাঁড়ি। বেশ না হলেও দু চারটা পুঁলিশ এখানে টহল দিতে দাড়িয়ে থাকবে। গলির মুখে দাড়িয়ে আছি। কোনদিকে যাবো ঠিক করতে পারছি না।

পশ্চিমে গেলে পুঁলিশ ফাঁড়ি। উত্তর দিকে গিয়ে কোন কাজ নেই। অবশ্য কোন দিকেই আমার কাজ নেই। দক্ষিণে গেলে চৌহাট্টার দিকে যাওয়া যায়। দক্ষিণে যাবো নাকি আবার গলির ভিতর দিয়ে পিছু ফিরে যাবো ঠিক করতে পারছি না।
: এই,এদিকে আয়।
টহলে থাকা একজন পুঁলিশ ডাক দিলো। এগিয়ে গেলাম।
: জ্বি স্যার,বলেন।
: নাম কী তোর?
: পার্থ।
: আগে পিছে কিছু নাই?
: আছে। সবাইকে পুরো নাম বলার প্রয়োজন বোধ করি না।
: প্রয়োজন আমাদেরও নেই। এতক্ষন ধরে এখানে দাড়িয়ে আছিস কেনো? মতলব কী?
: কোন দিকে যাবো সেটা ঠিক করছিলাম।
: জানিস না লকডাউন চলছে? বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বেরোনো নিষেধ।
: বিশেষ প্রয়োজনেই বেরিয়েছি।
: আচ্ছা ! সেই বিশেষ প্রয়োজনটা কী?

: সেটা যে আপনাদের বলতেই হবে এমনতো কোনো আইন করা হয় নি।
: তোকে দেখেতো মনে হচ্ছে না তোর কোনো কাজ থাকতে পারে। কেনো বেরিয়েছিস?
: প্রেমের জন্য স্যার। প্রেমতো সমাজ বুঝে না,আইর বুঝে না,ধর্ম বুঝে না। লকডাউনও বুঝে না।
: এটা কোনো বিশেষ বিষয় হলো??
: গোটা পৃথিবীতে ওটাই বিশেষ বিষয়।
: চুপ হতচ্ছাড়া !
পাশ থেকে কন্সটবল বললো,
: স্যার,লোকটাকে আমার গোলমাল লাগছে।
: হ্যাঁ,আমারও গোলমাল লাগছে। এক কাজ করো। লকাপে ডুকিয়ে দাও।
আমি বললাম,
: কেনো স্যার?
: তোকে আমাদের সন্দেহ হচ্ছে।

আমি এখন লকাপে। হঠাৎ করে লকাপে ডুকাটাও একটা ভিরাট ইন্টারেস্টিং বিষয়।একটু আগেই আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না যে কোন দিকে যাবো। একটু পরে যে লকাপে ডুকে যাবো তা ভুল করেও ভাবিনি। এই-ই ভালো। পৃথিবীতে সবকিছু ভেবে চিন্তে হয় না। মানুষের অর্ধেকের বেশি কাজই হঠাৎ করে, না ভেবে চিন্তেই হয়ে যায়।

লকাপ থেকে ছাড়লো শোয়া বারোটার দিকে। ওখানে সময়টা খারাপ কাটে নি। বাইরে বেরিয়ে কি করবো? কোথাও কেউ নেই। দু হাত পেছনে নিয়ে হিমুর ভঙ্গিতে হাটা ধরেছি। জুতা পায়ে ছিলো না। আমি পৃথিবীতে ঐ একজন মানুষকে অনুসরণ করি। অন্য কাউকে না। হিমুকে খুব ভালোবাসি। হিমু ভাই বলে গিয়েছেন,”যদি শুনি আমি চলে যাওয়ার পরও কেউ রাত দুপুরে খালি পায়ে হাটে তবে খুশি হবো।” তাই হিমু ভাইকে খুশি করার আমার এ প্রচেষ্টা।

আকাসে মিঠমিঠ করে তাঁরা জ্বলছে। আজ তাঁরা দেখতে ইচ্ছে করছে না। আবারও পুঁলিশের নজরে পড়ে গেলাম।
: আপনি এতো রাতে কোথা থেকে আসছেন?
: আপনি কি ভূলানাথ?
: আমার কথার জবাব দিন। আমাকে উল্ঠো প্রশ্ন করছেন কেনো?
: থানা থেকে আসছি।
: এতো রাতে থানায় কি জন্যে?
: আপনিইতো বিকেলে লকাপে ডুকিয়েছিলেন। ওসি সাহেব আমাকে ছেড়েছেন।
: ওহ আচ্ছা ! মনে পড়েছে।
: হি হি হি ! আপনি মনে হয় একটু বেশিই ভুলেন।
: হ্যাঁ হ্যাঁ। বয়স একটু বেশিই হয়ে গেছে।
: বয়স কমিয়ে দিন তাহলে আর ভুলবেন না।
: কি রকম?

: সেটা আমি জানি না। আমি আপনাকে ভুলানাথ বাবু বলেই ডাকবো। তাহলে আপনার সাথে দেখা হলেই আমাকে চিনতে পারবেন। আপনার বাবার দেয়া নামটা অনেক লম্বা। ” মোজাম্মেল করিম”।
: তুমি কি করে জানলে নামটা আমার বাবার দেয়া?
: আমি কখন বললাম নামটা আপনার বাবারই দেয়া? আন্দাজে ঢিল ছুড়েছি। লেগে গেলো নাকি?
কন্সটবল ভুলানাথ বাবুর কানে ফিসফিস করে বললো,
: স্যার,মনে হচ্ছে লোকটার মাথায় সীট আছে। ছেড়ে দিন।
ভুলানাথ বাবু আমাকে বললেন,
: লকাপ থেকে বেরিয়েছিস ভালো কথা,এখন সোজা ঘরে চলে যাবি। না হলে আবার লকাপে ডুকিয়ে দেবো।
: লাভ নাই। আপনি ডুকাবেন আর ওসি সাহেব বের করে দেবেন। মন দিয়ে ডিউটি করেন। আসছি ভুলানাথ বাবু।
হিমুর মতো হাটা শুরু করলাম।


“গল্প: আজ ফাঁকা শহর”
আয়েশা মুমিন
( চলমান)