• আজঃ বুধবার, ৬ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২১শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

লিভারে চর্বি পাওয়া গেছে। কি করব? আসুন জেনে নেই

প্রায় একটা প্রশ্ন পাই। লিভারে চর্বি পাওয়া গেছে। কি করব? আসুন জেনে নেই

#ফ্যাটি লিভার কি?
লিভারের কোষে কোষে যখন অতিরিক্ত মাত্রায় ফ্যাট বা চর্বি জমে, এ অবস্থা কে তখন বলা হয় ফ্যাটি লিভার।

অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যালকোহল পান যারা করেন তাদের অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার (Alcoholic Fatty Liver) হয়। অ্যালকোহল পান করেন না অথচ বিভিন্ন কারনে লিভারে ফ্যাট জমে যে ফ্যাটি লিভার হয়, সেটিকে বলা হয় নন- অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার (Non Alcoholic Fatty Liver), সংক্ষেপে NAFL।

সারা বিশ্বে নন- অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার রোগীর সংখ্যা দিন দিন এতই বাড়ছে যে, বর্তমানে ফ্যাটি লিভার বলতে মূলত নন- অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারকেই বোঝায়।

একটা সময় ছিল যখন ধারণা করা হত হার্ট বা ব্রেনে চর্বি জমে হার্ট-অ্যাটাক বা স্ট্রোক এর মত মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করলেও লিভার এর ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু বিগতে দশকে এই ধারনার আমূল পরিবর্তন হয়েছে।

পশ্চিমা বিশ্বে মোট জনসংখ্যার ২০%- ৩০% এ ফ্যাটি লিভার রয়েছে। উন্নয়নশীল অনেক দেশেও ফ্যাটি লিভার রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আমাদের দেশের চিত্র কেমন? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ব বিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগে আগত রোগীদের নিয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে এখানে আগত রোগীদের ২২% ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। সাধারণ জনগোষ্ঠীর উপর করা সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে আমাদের দেশের প্রায় ৩৪% লোকের ফ্যাটি লিভার রয়েছে যা সাধারণ ধারনার চেয়ে অনেক বেশী এবং আশংকা জনক।

ফ্যাটি লিভারের কারন কি কাদের বেশী হয় ?

ফ্যাটি লিভারের কারন অনেক। অতিরিক্ত ওজন এর প্রধান কারন। ডায়াবেটিস রোগীদের আক্রান্ত হওয়ার প্রবনতাও অনেক বেশী। এছাড়া রক্তে চর্বি বেশী থাকা, উচ্চ রক্তচাপ, ইনসুলিন রেজিস্টেন্স, হাইপোথাইরয়েড এর উল্লেখযোগ্য কারন।

তবে যাদের উচ্চতা অনুযায়ী ওজন (BMI) তেমন বেশি নয়, তাদের জন্য ও সুখবর নেই। অধিক ওজনের অধিকারী না হয়েও পেটে মেদের আধিক্য বা ভুড়ীর উপস্থিতির কারনে এদের অনেকেই ফ্যটি লিভার এ আক্রান্ত হয়। কিছু কিছু গবেষণায় দেখা গেছে পেটে চর্বির আধিক্য বা ভিসেরাল ওবেইসিটি এশিয়ান্ দের ফ্যাটি লিভারের অন্যতম প্রধান কারন।

ফ্যাটি লিভার হলে কি কি হতে পারে? 
৬-২০ % ক্ষেত্রে লিভারে এক ধরনের ক্রনিক হেপাটাইটিস বা প্রদাহ সৃষ্টি হয় যার নাম নন-অ্যাল্কোহলিক স্টিয়াটো হেপাটাইটিস (Non alcoholic Steatohepatitis) সংক্ষেপে, NASH । যাদের NASH হয় তাদের প্রায় ৩০% পরবর্তীতে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুকি থাকে। এদের মধ্যে কেউ কেউ লিভার ক্যান্সারে ও আক্রান্ত হতে পারে। পশিমা দেশ গুলোতে অ্যালকোহল জনিত লিভার সিরোসিসের পরেই হচ্ছে NASH জনিত লিভার সিরোসিসের অবস্থান।

ফ্যাটি লিভারের লক্ষন ও রোগ নির্ণয়
ফ্যাটি লিভারের রোগীদের প্রায়ই কোন লক্ষণ থাকে না। কেউ কেউ পেটের ডান পাশের উপরের দিকে হাল্কা ব্যথা বা অস্বস্তির কথা বলে থাকেন। শারীরিক পরীক্ষায় এদের প্রায় ৫০% এর লিভার বড় পাওয়া যায়।

ফ্যাটি লিভার নির্ণয়ে সবচেয়ে সহজ এবং বহুল ব্যবহৃত ইনভেস্টিগেশন হচ্ছে আল্ট্রাসনোগ্রাম। এছাড়া এই ফ্যাটি লিভার এর কারনে আপনার লিভার ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কিনা সেটা বুজার জন্য SGPT আর serum lipid profile করা উচিত।

ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসা

শরীরের ওজন কমানো ফ্যাটি লিভার চিকিৎসার অন্যতম দিক। পাশাপাশি ফ্যাটি লিভারের কারন নির্ণয় ও এর যথাযথ চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।কম ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহন এবং ব্যায়াম ওজন কমানোর প্রধান হাতিয়ার ।

সাধারণত দৈনিক ৫০০-১০০০ কিলো ক্যালরি কম খাওয়া এবং সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন ৩০-৪০ মিনিট ব্যায়াম (জোরে হাঁটা, সাইক্লিং ইত্যাদি) ওজন কমানোর সর্বোৎকৃষ্ট উপায়। কাংখিত ওজন অর্জন করার পর সেটা মেইন্টেইন করার জন্য আপনাকে উপরোক্ত খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়াম চালিয়ে যেতে হবে। উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার, রিফাইন্ড সুগার, ব্যাভারেজ, ফাস্টফুড পরিহার করতে হবে।

যাদের লিভারে ক্রনিক প্রদাহ বা NASH দেখা দিয়েছে তাদের এসব নিয়মাবলী আরো কড়াকড়ি ভাবে মেনে চলতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৭-১০% ওজন কমালে NASH এর জটিলতা কমে যায়। এছাড়া NASH এর প্রদাহ ও জটিলতা কমাতে অনেক ঔষধ নিয়ে গবেষণা হচ্ছে । কিছু কিছু ঔষধে কিছু সফলতা দেখা গেলেও এখনো কার্যকরী ঔষধের অনুসন্ধান চলছেই।

জীবনযাপন প্রনালী এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধ ও চিকিৎসার প্রধান উপায়। আসুন কম ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহণ করি, নিয়মিত শরীরচরচার অভ্যাস গড়ে তুলি।।

ডা. কামরুজ্জামান
উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ

 

নিয়মিত আপডেট পেতে “প্রবাস জীবন” ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন