• আজঃ বুধবার, ১৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে কি কি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ?

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে কি কি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ?

উঃ আমরা পয়েন্ট বাই পয়েন্ট আলোচনা করবো। মন দিয়ে শুনুন –

১) HAND HYGIENE :

এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। হাতটা ভালো করে ধুতে হবে। একবার নয়, বারবার যতবার প্রয়োজন পড়ে।● হাত না ধুয়ে কিছু খাবেন না, এমনকি চোখও চুলকাবেন না।

● অফিস-কাছারি বা বাড়ির বাইরে লোকজনের সাথে যতটা সম্ভব hand contact এড়িয়ে চলুন।
● ট্রেনে-বাসে রড/হাতল ধরার পর সচেতন থাকুন যেন যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব হাতটা ধোওয়া যায়।
● হাত ধোওয়ার জন্য সাবানজলই যথেষ্ট ! মনে রাখবেন soap + running water এর মতন কার্যকরী handwash এখনও তৈরি হয়নি। এমনকি বিশেষ কোনও সাবানেরও দরকার নেই ! আপনি নিত্যদিন বাড়িতে যে সাবানে হাত পরিষ্কার করেন সেটা হলেই চলবে।
● এছাড়া অবশ্যই alcohol-based hand sanitizer ব্যবহার করতে পারেন, তবে এমনটা নয় যে ওটা না দিলে আর হাত পরিষ্কার হবে না। যদি hand sanitizer না থাকে তাহলে জাস্ট একটা সাবান কাছে রাখবেন আর প্রয়োজন পড়লেই সেটা দিয়ে হাত ধুয়ে নেবেন।
● হাত মোছার জন্য পরিষ্কার রুমাল বা টিস্যু ব্যবহার করুন। যদি নাক ঝাড়েন তাহলে সেই হাতটা টিস্যুতে মুছুন এবং সঠিক জায়গায় টিস্যুটা ফেলুন। যত্রতত্র ফেলবেন না।
● নাক ঝেড়ে হাত মোছার জন্য রুমালের চেয়ে টিস্যু ব্যবহার করা অনেক ভালো, কারণ ওই নোংরা রুমালটা বারবার ব্যবহার করা আর পকেটে/ব্যাগে রাখা মানেই আরো বিপদ বাড়ানো।
● হাত ধোয়ার নিয়ম আছে। কমপক্ষে ১৫ সেকেন্ড ,ঘসে ঘসে ।

২) COUGH ETIQUETTE & RESPIRATORY HYGIENE :-

● হাঁচি অথবা কাশির সময়ে মাথা ঘুরিয়ে কাশবেন।

● হাঁচি/কাশির সময়ে নাক এবং মুখের উপর টিস্যু ধরবেন।

● হাঁচি/কাশির পর সঠিক জায়গায় টিস্যু ফেলবেন। যেখানে সেখানে ফেলবেন না। এরপর অবশ্যই ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধোবেন।

● যদি মাস্ক পরে থাকেন তাহলে ওই অবস্থাতেই হাঁচবেন/কাশবেন।

● দয়া করে মাস্ক সরিয়ে কম্মটি করবেন না।

● এরপর অবশ্যই সেই মাস্কটা খুলবেন, সঠিক জায়গায় বর্জ্য হিসাবে ফেলবেন এবং ভালো করে হাত ধোবেন।

● যদি হঠাৎ এমন জোর হাঁচি পায় যে টিস্যু বার করার সময় পেলেন না তাহলে কনুই ভাঁজ করে জামার হাতা দিয়ে মুখ গার্ড করুন। এটা হাত দিয়ে মুখ ঢাকার তুলনায় বেটার অপশন।

■ মাস্কের প্রয়োজনীয়তা এবং ব্যবহার : –
এই এক গোলমেলে জিনিস ! বহু স্কুল অফ থটস্ বাজারে ঘুরছে, আমি সেসব উহ্য রেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন বলছি।

● প্রথমত, মাস্ক ব্যবহার করা মানেই করোনার বিরুদ্ধে সুরক্ষাকবচ পরে ফেলা নয়। আসল হলো hand hygiene maintain করা। শুধু মাস্কের ব্যবহারে সংক্রমণ আটকানো যায় না, যাবে না।

● নাম্বার টু, মাস্ক সবাইকে পরতে হবে এমন কোনও মানে নেই। অকারণে মাস্কের ব্যবহার শুধু যে খরচ বাড়ায় তাই নয়, তার সাথে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করে ,যেমন এখন করছে।

● তিন নম্বর কথা হলো অনেকে মাস্ক পরে ভাবছেন সাঙ্ঘাতিক লেভেলের সতর্কতা নিয়ে ফেলেছেন, অতএব আর চিন্তা নেই ! এর ফলে আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি অবহেলিত হয়, যেমন হাত ধোওয়া।

■ মাস্ক কারা পরবেন না?

●কোনও সুস্থ মানুষ, যিনি বিগত দু-সপ্তাহের মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমিত কোনও দেশ অথবা রাজ্য থেকে আসেন নি, তাঁর মাস্ক পরার প্রয়োজন নেই।

●কোনও সুস্থ মানুষ, যিনি কোনও COVID-19 suspected case-এর সংস্পর্শে নেই অথবা তাঁর পরিচর্যা করছেন না, তাঁর মাস্ক পরার প্রয়োজন নেই।

■ মাস্ক কারা পরবেন অথবা পরতে পারেন?

● যাঁরা সরাসরি রোগীদের সংস্পর্শে আসছেন, অর্থাৎ ডাক্তার এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী।

● হাঁচি-কাশি জ্বর শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি শ্বাসনালিতে সংক্রমণের লক্ষণযুক্ত কোনও ব্যক্তি।

● কোনও সুস্থ ব্যক্তি, যিনি হাঁচি-কাশি জ্বর শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি শ্বাসনালিতে সংক্রমণের লক্ষণযুক্ত কোনও ব্যক্তির পরিচর্যা করেন বা সংস্পর্শে আসেন অথবা এক মিটারের কম দূরত্ব থেকে তাঁর সাথে interact করেন।

অতএব বুঝতেই পারছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী আমাদের অধিকাংশ লোকেরই মাস্ক পরার প্রয়োজন নেই। যাঁরা ট্রেন/বাস ইত্যাদি public conveyance এ যাতায়াত করছেন তাঁরা অবশ্য মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন, তবে তার সাথে handwashing বাধ্যতামূলক। স্রেফ মাস্কের ব্যবহারে কোনও লাভ নেই যদি না handwashing ঠিকঠাক করেন।

কি ধরনের মাস্ক ব্যবহার করবেন ?

এর একটাই উত্তর – Medical Mask, অর্থাৎ 3-pleated 6-lamellar disposable mask. সোজা কথায়, ওষুধের দোকানে যে মাস্কগুলো পাওয়া যায়।

● সাধারণ জনগণের জন্য N95 মাস্কের কোনও প্রয়োজন নেই।

● একটা মাস্ক একবারই ব্যবহার করা যাবে, তারপর ফেলে দিতে হবে।

● একটা মাস্ক একটানা ততক্ষণ ব্যবহার করা যাবে যতক্ষণ না নিশ্বাসের ভাপে অথবা ঘামে moist হচ্ছে না। বর্তমান আবহাওয়ায় এই সময়কালটা ৬ থেকে ৮ ঘন্টা।

● হাঁচি/কাশি পেলে মাস্ক পরিহিত অবস্থায় সেটা করতে হবে, এবং সঙ্গে সঙ্গেই সেই মাস্ক খুলে, নিরাপদ জায়গায় রেখে, handwashing করে তবেই আরেকটা মাস্ক পরতে হবে।

● Pollution আটকানোর জন্য বাজারচলতি যেসব মাস্ক আছে সেগুলো করোনাভাইরাস আটকানোর কাজে লাগবে না।

● মাস্ক পরার পর মাস্কের উপর আর হাত দেবেন না।

৩) SOCIAL DISTANCING :-

● জনবহুল জায়গায় যাবেন না অথবা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলবেন।

● সভাসমিতি, মিটিং, মিছিল, ইত্যাদি জনসমাগম সরকারি ভাবে নিষিদ্ধ করা হলেও টুকটাক চলছে না তা নয় ! দয়া করে সেখানে যাবেন না বা অংশগ্রহণ করবেন না।

● যতটা সম্ভব নিজেকে গৃহবন্দী করে ফেলুন। খুব দরকার ছাড়া ঘরের বাইরে যাবেন না।

● একসাথে বেশি বাজার করে রাখুন যাতে রোজ-রোজ বাজারে ছুটতে না হয়।

● রেস্টুরেন্টে খাওয়া আপাতত বন্ধ রাখুন।

● অফিসে যাঁরা আপনার সাথে কথা বলতে আসবেন অথবা অন্যান্য কাজের জন্য আসবেন তাঁদের পরিস্কার বলে দিন টেবিলের ওপাশ থেকে কথা বলতে। টেবিল ডিঙিয়ে ঘাড়ের কাছে এসে কথা বলা অ্যালাউ করবেন না। প্রয়োজনে টেবিলের উপর নোটিশ সাঁটিয়ে দিন।

● আত্মীয়-কুটুম্বিতা আপাতত বন্ধ রাখুন। অসামাজিক হয়ে যান কিছুদিনের জন্য।

৪) অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা :-

●Hand-to-hand contact এর দ্বারা রাস্তায় যেসব খাবার খান, যেমন ফুচকা/আলুকাবলি/কাটা ফল সেগুলো খাবেন না।

●সিগারেট/বিড়ির নেশা থাকলে লুজ সিগারেট-বিড়ি কিনবেন না। প্যাকেট সহ কিনবেন, প্যাকেটটা hand sanitizer দিয়ে একটু বুলিয়ে নেবেন, খাওয়ার আগে হাত পরিষ্কার করে তবে প্যাকেট থেকে বার করবেন। দোকান থেকে দোকানদারের হাতে করে দেওয়া লুজ সিগারেট কিনে ধরাবেন না।

● রাস্তায় যত্রতত্র থুতু/কফ ফেলবেন না।

● বাইরে থেকে ঘরে ঢুকে জামাকাপড় ছেড়ে ফেলবেন। কাচার পর তবে আবার সেই জামাকাপড় ব্যবহার করবেন। ঘরে ঝুলিয়ে রাখবেন না।

● বাইরে থেকে কোনো অতিথি/আত্মীয় বাড়ি এলে তাঁকে আগে hand wash করতে বলবেন। বিছানায় বসাবেন না। সোফা/চেয়ার/মেঝেতে (যেমন আপনার খুশি) বসান। নিজে তাঁর থেকে অন্তত এক মিটার দূরে বসুন। তিনি চলে যাওয়ার পর সেই জায়গাটা এবং তার চারপাশের এক মিটার এরিয়া সাবানজল/ফিনাইল/কলিন ধরনের জিনিস দিয়ে মুছে নেবেন। যদি সেটা টেবিল হয় তাহলে টেবিলের উপর কলিন ধরনের জিনিস দিয়ে মুছবেন। টেবিল কভার হলে কেচে নেবেন। যদি একান্তই বিছানায় বসাতে বাধ্য হন তাহলে বিছানার চাদর কেচে নেবেন।

●বাইরে থেকে এসে মোবাইল/পেন/পার্স/ব্যাগ ইত্যাদি জিনিসগুলো hand sanitizer দিয়ে একপোঁচ বুলিয়ে নেবেন।

■ কোনো প্রকার গুজবে কান দেবেন না, প্রশ্রয় দেবেন না এবং ছড়াবেন না।এটা পরিকল্পিত মহামারী, অমুক দিন থেকে কমে যাবে, চোদ্দ ঘন্টার কার্ফু হলেই করোনা শেষ …. এই ধরনের আজগুবি জিনিস প্রশ্রয় দেবেন না এবং অবশ্যই ছড়াবেন না। এর ফলে একটা false sense of security তৈরি হয় মানুষের মনে, যা কিনা অতি, অতি ভয়ংকর !

■ সচেতন হোন। সচেতন করুন। মনে রাখবেন, একমাত্র সচেতনতাই পারে আমাদের এই ভয়াল বিপদ থেকে রক্ষা করতে। যে দেশের জনসংখ্যা এত বেশি সে দেশে এই মহামারী ঠেকাতে হলে সচেতনতাই একমাত্র অস্ত্র। এখনও যদি আমরা সচেতন না হই তো করোনাভাইরাসের সামনে স্রেফ উড়ে যাবো।
■ সচেতন হোন, সরকারের সাথে সহযোগিতা করুন এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাথে যুক্ত মানুষজনের উপর আপাতত ভরসা রাখুন। আপাতত নিজে বাঁচুন এবং অন্যকে বাঁচান !

writer : Muhammad Ali Suza