• আজঃ রবিবার, ১২ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

গল্প: পার্থ এবং কয়েকটি কুকুর – আয়শা মুমিন (শেষ পর্ব )

আমি সেখান থেকে বিদায় নিলাম। লেবু চাচা আর কিছু পারুক আর না পারুক,মনে মনে বিচ্ছিরি যত গালি আছে সব আমাকে ঝেড়ে দিচ্ছে হয়তো।
পথে রফিক খালুর সাথে দেখা।
: এই পার্থ,দাড়া।
: কী মামা?
: তোর সাথে কথা আছে।
: এখন সময় নেই। জরুরী কাজ আছে। পারলে একবার মেসে আসবেন। খালু হাহা করে হেসে ফেললেন।
: হাসেন কেনো?

: তরতো কোনো কাজই নেই। জরুরী আসবে কোথা থেকে? হা হা হা!
: আপনার কাছে যেটা কাজই না আমার কাছে সেটাই জরুরী। আপনার এই বোকা মার্কা হাসি শুনার সময় আমার নেই। চললাম।
বেচারা আচমকাই হাসি বন্ধ করে দিলেন। আর কোনো কথা বললেন না। বোধ হয় মনে খুব কষ্ট পেয়েছেন।
সন্ধার পর আমার ঘুমানোর সময়। কারণ,মাঝরাতে আমি শহরের এ গলি হতে ও গলি হেটে বেড়াই। সারা শরীর লেফ দিয়ে মুড়ে শুয়ে আছি। ঐ ছেলেটার কথা মনে পড়েছে।

সে হয়তো আমাকে নিয়েই ভাবছে। কে আমি,তাকে কী করে চিনি,আমি তার কে হই। হয়তো ভাবছে আমি তার ছোটবেলার খুব পরিচিত একজন। দীর্ঘ দিন দেখা সাক্ষাত হয়নি বলে সে আমাকে চিনতে পারছে না। এটাই হয়তো ভাবছে। এরকমটা ভাবতে ভাবতে সে হয়তো এই ভাবনা মন থেকে ঝেরে ফেলে দিয়েছে।রফিক খালু এসে হাজির। আজ আর ঘুমানো যাবে না। লোকটা অতি বাচাল টাইপের।
: পার্থ,ঘুমাচ্ছিস নাকি?
: নাহ্,আপনার কথাই ভাবছি। আপনার কথা ভাবতে হলে আয়োজন করে ভাবতে হয়। তাই লেফ মুড়িয়ে শুয়েছি।
উনি বুঝতে পারছেন উনাকে নিয়ে আমি ট্রল করছি।

: আপনি কি যেনো বলতে চেয়েছিলেন,বলুন।
: বলছিলাম যে,তোর খালাকে ফিরিয়ে আনা যায় কিনা? তুই দেখ না কিছু করতে পারিস কিনা।
: করা যাবে। কিন্তু আমি করবো না।
: কেনো,করবি না কেনো? সমস্যা কী?
: একবার কি ভেবে দেখেছেন,শুরু থেকে এই পর্যন্ত যে আপনার হাজারটা অভিমান ভাঙিয়ে আসছে নানান কায়দায়,আপনি কি কখনো তার একটা অভিমানও ভাঙিয়েছেন? ভাঙান নি। অভিমান ভাঙানোর কাজটা সবাইকে দিয়ে হয় না। সেই সুযোগটাও সবার হয় না। যাদের হয় তারা অনেক বড় ভাগ্যবান। আপনার হয়েছে,আপনি কাজে লাগান নি।

: পার্থ,আমি মানছি আমার ভুল হয়েছে। কিন্তু তুই একবার চেষ্টাতো কর।
: ভেবে দেখি। আপনি এবার যেতে পারেন। আমি ঘুমাবো।
প্রতিরাতের মতো নিয়ম মেনেই মাঝরাতে আমার ঘুম ভাঙলো। হাটতে বের হবো। দিনে কড়া রোদ আর রাতে হিম ঠাণ্ডা নেমে আসে। আজকাল আবহাওয়া বড় অনিয়মিক হয়ে উঠেছে। চাদর আছে,গায়ে মুড়াবো না। হিমুরা গায়ে চাদর মুড়ায় না।হাটতে লাগলাম অন্ধকারের মতো ঘাড়ো কুয়াশার ভেতর দিয়ে। রফিক খালুর কথা মনে পড়লো। আসলে ভুলটা খালু করেন নি। ভুলটা খালার ছিলো। শুধু ভুল না,মারাত্মক রকমের ভুল। বেচারা খালু অনেক চেষ্টা করেছেন খালাকে আটকাতে। খালা থাকতে চান নি। একদিন বিকেলে খালা ডিভোর্সের সব ফাইন্যাল কাগজপত্র এনে খালুর সামনে টেবিলে রাখলেন। বললেন,
: আমি চলে যাচ্ছি।
ব্যাস,চলে গেলেন।

জীবন বড় নিঠুর। জীবন মানে যাকে হারানোর ভয় সবচেয়ে বেশি, যাকে না হারানোর জন্য সারা দিন প্রাণপনে লড়াই করা,বেলা শেষে বিজয়ের ঠিক আগ মূহুর্তে সেই তাকেই হারায়ে ফেলার করুন কাহিনী।  এই পৃথিবীতে কেউ সুখী না। সুখী মানুষের বড় অভাব। তুমি যদি সুখী মানুষ খোঁজতে
অনুসন্ধান চালাও তাহলে একশো জনের মধ্যে একজনও সুখী মানুষ খোঁজে পাবে না। প্রত্যেক মানুষের ভেতরে কোনো না কোনো অসুখ রয়ে গেছে।

আকষ্মাত আকাশের দিকে চোখ পড়লো। ভাবনাগুলো উদাও হয়ে গেলো ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে। তারাগুলো মিঠমিঠ করে হাসছে। মধ্যখানে আস্ত এক খণ্ড চাঁদ। ইনি হলেন তারাদের রাণী।  কখন যে কয়েকটা কুকুর আমার পিছু নিয়েছে টের পাই নি। আমি থামলে ওরাও থামে। আমি হাটলে ওরাও হাটে। আমি আকাশের দিকে তাকালে ওরাও তাকায়।  শেষ রাতে তারাদের ব্যাঙ্গার্থক হাসি অব্যাহত রইলো।
(সমাপ্ত)