• আজঃ বুধবার, ১৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

গল্প: পার্থ এবং কয়েকটি কুকুর – আয়শা মুমিন (২য় পর্ব )

: মা,এটা ভাইয়া না। এটা অন্য কেউ।
বাবা আমাকে বললেন,”তুমি কে? সত্যি কথা বলো।
: আমি পার্থ। আমি রবি না।
পেট মোটা আঙ্কেল এগিয়ে এসে বললেন,
: আগে বলো নি কেনো?
: বলার সুযোগ দিলেন কোথায়?
মা নামের মহিলা এটা মানতে রাজি নন। উনি বলছেন,
: না,এ পার্থ নয়। এ আমার ছেলে রবি। মায়েরা এমনই হয়। পৃথিবীর সব সন্তানকে নিজের সন্তান মনে করে। বাবাদের মধ্যে এটা থাকে না। বাবারা সহজে কাউকে নিজের ভাবে না। কুড়ি বছর বয়সী মেয়েটা বললো ।

: মা,উনি ভাইয়া নয়। ভাইয়ার পায়ে একটা কাঁটার দাঁগ আছে। দেখো উনার পায়ে ওটা আছে কিনা।  মা দেখলেন আমার পায়ে কোনো কাঁটা দাঁগ নেই।  তবুও মা মানতে চাইছেন না যে,আমি উনার রবি না। উনি আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।  বাবা বললেন ।
: বাবা,তুমি যেতে পারো। আমরা তোমার সময় নষ্ট করেছি। কথাটার মধ্যে হতাশ হতাশ ভাব ছিলো। যতটা আশা নিয়ে তারা রবিকে দেখতে এসেছেন,রবির বদলে আমার পরিচয় জেনে উনারা ততটাই হতাশ হয়েছেন। আমি কিছু বললাম না। বেরিয়ে পড়লাম। তবে মেয়েটার ভাবনার অবসান হয় নি। এটা নিশ্চিত হয়েছে যে,আমি তার ভাই না। কিন্তু এটা সে ভাববেই,আমি তার এতো কিছু কেমন করে জানি। সেটা আমিও জানি না। অনেক রাত হয়ে গেছে। পৌনে বারোটা বাজে। ঘরে ডুকতেই কুদরত মিয়া বললো ।

: সকালে যে ভদ্র মহিলা এসেছিলেন,উনি আপনাকে একবার যেতে বলেছেন।
: আচ্ছা,আর কি যেনো খাবার এনেছিলেন ওটা কোথায়?
: ওটা আমাকে খাইয়ে দিয়ে চলে গেছেন।

: আচ্ছা,তুমি যাও।
ঘুমাবো না। এখন ঘুমানোর সময় না। এখন আমার রাস্তায় হেটে বেড়ানোর সময়। প্রচণ্ড শীত পড়েছে। গায়ে কিছু জড়াই নি। ঠান্ডা বাতাস জামা বেদ করে বুকে ডুকছে। বুকে চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে। রুনুর কথা মনে পড়লে আমার এরকম হয়। কঠিন যন্ত্রণা অনুভূত হয়। যেনো কেউ বিশ্রামহীনভাবে তীর ছুরে মারছে আমার বুকে। ধনুঁকের তীরের আগায় কী থাকে জানি না। কিন্তু মায়াবতীদের প্রেমে নির্ঘাত বিষ থাকে।

জীবন প্রতিটা মূহুর্তে আমাদের কিছু না কিছু শিখায়। জীবন থেকে নেয়া প্রতিটা শিক্ষাই নোট করে রাখা উচিত। ভবিষ্যতে অনেক বিপদ-আপদ থেকে বাঁচা যায়। আর কিছু হোক বা না হোক,অন্তত হৃদয়ের রক্তক্ষরণ থেকে বাঁচা যাবে। নিজের মনের উপড় চরম ভোগান্তি পোহাতে হবে না। নাহ্,আজকে হাটতে ভালো লাগছে না।

নিজেকে ভীষণ রকম ক্লান্ত লাগছে। রুনুর কথা মনে পড়লে আমার খুব কষ্ট হয় ভেতরে। এখন আমার উচিত ঘুমিয়ে পড়া। মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন সুখ,দুঃখ কোনোটাই তার অনুভূত হয় না। বিষয়টা অদ্ভুত এবং অস্পষ্ট। ঘুম ভাঙলো সকাল আটটায়। ঘরে থাকতে একদম ইচ্ছে করে না আমার। হিমুরা খুব কম সময়ই ঘরে থাকে। বেরিয়ে পড়লাম। মেসের সামনে রাস্তায় এক ভদ্রলোক ভ্যানে করে শরবত বিক্রি করেন। লেবুর শরবত।

: লেবু চাচা, ব্যবসা কেমন চলছে?
বিরক্তি নিয়ে লোকটা বললো,”ভালো চলছে।” বিরক্তি নেয়ার কারণ হলো,বেচারার সুন্দর একটা নাম থাকতে আমি উনাকে লেবু চাচা বলে ডাকি। প্রতিদিন অকারণেই বাজে কথা বলি। যেমন,আপনার শরবত মোটেও ভালো হয় না। আপনি শরবতের দাম বেশি নেন,আপনি লোক ঠকান,আপনি ভালো লোক না। তাই আমাকে দেখা মাত্র বেচারার চেহারায় তীক্ততা এবং বিরক্তি নেমে আসে। লোকটা আমাকে একদমই সহ্য করতে পারে না।

: লেবু চাচা,আপনার এক গ্লাস শরবতের দাম কতো?
: বিশ টাকা।
: আগের কাস্টমারের কাছ থেকে দশ টাকা রেখেছেন। আমার বেলায় বিশ টাকা কেনো?

:এই মিয়া,আমার যার কাছ থেকে যত ইচ্ছা তত রাখবো। তোমার এতো চুলকায় কেনো? তোমার সমস্যা?
: নাহ্। আচ্ছা এক গ্লাস শরবত দেনতো। লোকটা রাগ,ঘৃণা আর বিরক্তির সবটুকু নিয়ে আমাকে শরবত বানিয়ে দিলো।
: আহ! দারুন হয়েছে। চিনি আরেকটু বেশি হলে সেই রকম স্বাদ হতো। লেবু চাচা কিছু বললেন না। বিরক্তি নিয়ে আমার বিরক্তিকর শরবত টানা দেখছেন। মনে মনে অপেক্ষা করছেন,আমি কবে বিদায় হবো। লোকটাকে বিরক্ত করতে ভালোই লাগছে। আরেকটু বিরক্ত করা যাক।
: কি দারুন গড়ম পরেছে তাইনা লেবু চাচা? লেবু চাচা কিছু বললেন না। তার চেহারায় বিরক্তি যেনো আরেকটু তীব্র হয়ে নেমে আসলো। রাস্তার ওপাশ দিয়ে একটা মোটা মার্কা ছেলে হেটে যাচ্ছিলো। তাকে ডেকে আনলাম।
: কিরে কেমন আছিস? অনেক দিন পর দেখা হলো। ছেলেটা রিতীমতো হতবাক হয়ে গেলো। সে আমাকে চেনে না। অবশ্য আমিও তাকে চিনি না,কোনো দিন দেখিও নি। লেবু চাচাকে আরেকটু বিরক্ত করার জন্য ছেলেটাকে ডাকলাম। ছেলেটা ভয়েভয়ে বললো,

: ভালো আছি।
: আঙ্কেল,আন্টি কেমন আছেন?
: ভালো আছেন। সে এখনো আমাকে চেনার চেষ্টা করছে। মনে করতে চাইছে,আমি তার কোন পরিচিত জন।

: তুই হাল্কা শুঁকিয়ে গেছিস মনে হচ্ছে। হাতে ওটা কী? ময়লা ফেলতে যাচ্ছিস? তোদের বাসায় যা ময়লা হয়! ছেলেটা আরো বেশি বিষ্মিত হয়ে গেলো। সত্যি বোধ হয় এদের বাসায় ময়লা বেশি হয়। আগে বোধ হয় আরো মোটা ছিলো ছেলেটা। আমাকে সে চিনতে পারে নি,সেটা আর প্রকাশ করে নি।  তবে আমি বিষয়টা বোঝতে পারছি। তাকে বিদায় দিলাম। লেবু চাচাকে বিশ টাকার বদলে পাঁচ টাকার একটা সিঁকি দিলাম।

: বাকি টাকা কই?
: আমার কাছে আর নেই।
: নেই মানে? তাইলে আমার টাকা কে দিবো?
: উপরওয়ালা দেবেন। সবইতো উনি দেন।
: এই মিয়া,ইয়ার্কি করো? টাকা দেও,না হলে এখান থেকে যেতে পারবা না।
: যাওয়ার বিশেষ প্রয়োজন নেই। তুমি চাইলে এখানে থেকে যেতে পারি। লোকটা রাগে কিছু বলতে পারছে না।
: দেখেন লেবু চাচা,আমার পঞ্জাবীতে পকেট নাই। হিমুদের পাঞ্জাবীতে পকেট থাকে না। হিমুদের টাকার প্রয়োজন নেই তাই দুশ্চিন্তাও নেই।  আপনি পারলে পেট থেকে শরবতটা বের করে নিয়ে যেতে পারেন।  আমার আপত্তি নেই।
(চলবে….)