• আজঃ সোমবার, ১৩ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

গল্প: পার্থ এবং কয়েকটি কুকুর – আয়শা মুমিন (১ম পর্ব )

পৃথিবীটা অনেক বড় রঙ্গমঞ্চ। সেখানে আমরা প্রত্যেকেই এক এক জন শিল্পী এবং ভালো মানের শিল্পী। মিনা খালা এসেছেন। এই মহিলা আমাকে খুব যত্ন করেন। কেনো করেন তা জানি না। বাসায় ভালো কিছু রান্না করা হলে আমাকে ডেকে পাঠাবেন,না হয় নিজেই আমার মেসে নিয়ে আসবেন। তবে যাই হোক,যত্নটা কিন্তু নিঁখুত এবং ঝামেলাহীন।
: স্যুপটা খেয়ে নে। আমার একটু তাড়া আছে,চলে যাবো।
: আমারো তাড়া আছে। তুমি বসো,আমি পরে এসে খাবো। খালা কপাল কুঁচ করে আমার দিকে থাকালেন।
: ইয়ার্কি করবি না,মোটেও সময় নেই।

আমি খাতা থেকে পৃষ্টা ছিড়ে ভাজ করে পকেটে ডুকালাম। কোনো কথা না বলে বেরিয়ে পরলাম। পর্ণার কাছে চিঠি লিখছিলাম এতক্ষণ,চিঠিটা পকেটে নিয়ে ঘুরছি। হঠাৎ একটা কালো গাড়ি এসে আমার সামনে দাড়ালো। চার পাঁচটা লোক গাড়ি থেকে নেমে আমাকে টেনে হিচড়ে গাড়িতে তুললো। আমি কিছুই বলি নি। তেল চিটচিটে চামড়ার ধূসর বর্ণের লোকটা কারো সঙ্গে ফোনে কথা বলছে।

: স্যার,আমরা রবিকে খুঁজে পেয়েছি। আমরা ওকে নিয়ে আসছি স্যার। ওর বাবা-মাকে খবরটা দিন। আমার হঠাৎ মনে পড়লো,চিঠিতে একটা শব্দের বানানে মারাত্মক ভুল করেছি। শব্দটা ঠিক না করলেই নয়। পকেট থেকে চিঠিটা বের করে পড়তে লাগলাম। লোকগুলো আমার চিঠি পড়াকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। এমন ভাব করছে,যেনো আমি সত্যিকারের পাগল।
: আহ্,চেচামেচি করবেন নাতো! গুরুত্বপূর্ণ চিঠি পড়ছি। এই কথাটারও যথাযথ গুরুত্ব পেলাম না।
এরা আমাকে নিয়ে ঠাট্টার হাসি হাসলো।
: স্যার,একটা কলম হবে?

একজন মুঁচকি হেসে আমার দিকে একটা কলম বাড়িয়ে দিলো। আমি শব্দটা ঠিক করে নিলাম।  আমি এখন পাগলা গারদে আছি। পাগলদের সাথে আমাকে রাখা হয় নি। স্পেশাল সেলে রাখা হয়েছে। আমার বাবা- মা আমার সাথে দেখা করতে আসবেন তাই। আমি এখন রবি। পার্থ কে ছিলো আমি জানি না। একটা লোক আসলো। এখানকার সব কর্মচারীদের তদারকি করছে। মনে হয় লোকটা এখানকার প্রধান। উনি আমার কাছে আসলেন। আমার মাঝেও কেমন একটা পাগল পাগল ভাব চলে আসলো। নিয়মিত পাগলামী শুরু করেছি।

: রবি,বাবা তুমি কোথায় ছিলে? পালিয়ে গেলে কেনো? এখানে কেউ তোমাকে টর্চার করেছে? মেরেছে?
উনি আমাকে বাচ্চাদের মতো আদর করে কথা বলছেন। আমিও বাচ্চাদের মতো আচরণ করছি। এই খেলাটা খুব ভালো লাগছে। নিজেকে বড় মানুষ সাজানো খুব সহজ কিন্তু বাচ্চা মানুষ সাজানো কঠিন কাজ গুলোর মধ্যে অন্যতম।
: বাবা,তুমি কিছু খেয়েছো? কিছু খাও নি তাই না? আঙ্কেল তোমার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করছি।
খাবারের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। মুরগ আর শুটকি মাছের তরকারি দিয়ে ভাত খেলাম। আমার বাবা-মা চলে এসেছেন। সঙ্গে একটা কুড়ি বছরের মেয়ে। সম্ভবত রবির বোন হবে। মা আমাকে দেখে কান্নায় ফেঁটে পড়লেন। আমার কপালে চুমু খেলেন।
: বাবা,তুই পালালি কেনো? এখানে কেউ তোকে মারধর করে? কিছু খেয়েছিস বাবা?দুদিন ধরে তোকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।দুদিন না খেয়ে থেকেছিস বাবা? তারপর কেঁদে কেঁদে বাবাকে বলতে লাগলেন,

: ওগো,আমি আমার ছেলেকে বাড়ীতে নিয়ে যাবো। এখানে রাখবো না। আমার ছেলের কষ্ট হয় এখানে। তারপর আবার আমার কাছে এসে আদর কর বললেন,
: কিছু খেয়েছিস বাবা?
: হ্যাঁ,ঐ আঙ্কেলটা খুব ভালো। উনি আমাকে খাইয়েছেন। আঙ্কেল আমার কাছে এসে আদর করে মাথায় হাত দিলেন।
: এতো ভালো হতে নেই আঙ্কেল। সবার খাবারের টাকা মেরে সবাইকে শস্তা ধরের চাল দিয়ে ভাত আর পাতলা ডাল দিয়ে খেতে দেন। আমাকে মুরগী আর শুটকি মাছের তরকারি দিলেন। এতো ভালো আজকাল পাওয়া যায় না আঙ্কেল। আঙ্কেল নিয়মিত হকচকিয়ে গেলেন। হয়তো ইচ্ছে করছে কিল-ঘুষি দিয়ে আমার নাক ফাটিয়ে দিতে কিন্তু পারছেন না। আমিতো মানসিক রোগী,আমার সাথে এমন করা যাবে না। তাই রাগটা সামলে নিলেন। সবার সামনে একটু মুঁচকি হেসে নিজের অপকর্মের অভিযোগটা ঢাকতে চেষ্টা করলেন। মা আমাকে বললেন,

: বোকা ছেলে। বোকাদের মতো কথা বলে না বাবা।
: মা, এটা ঠিক না। বোকাদের পাগল বলা যায়,কিন্তু পাগলদের বোকা বলা যায় না। পাগলরা কখনো বোকামি করে না। এবার বোধ হয় আঙ্কেল কিছু আঁচ করতে পেরেছেন যে,আমি রবি না। রবির মতো দেখতে। আমাকে ভুল করে তুলে আনা হয়েছে। কিন্তু তিনি এ বিষয়ে মুখ খুললেন না। নিজের ভুলের কথা স্বীকার করা প্রত্যেকটা মানুষের কাছেই লজ্জাজনক। কুড়ি বছরের ঐ মেয়েটার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে,সে আমায় সন্দেহ করছে। সে বোঝতে পেরেছে আমি রবি না। তাকে বললাম,
: কিরে ছেমড়ি,এতো শুকিয়ে গেলি কেনো? নিয়মিত খাওয়া দাওয়া হয় না তাইতো? আগের মতো এখনো খাবার বেলা মায়ের সাথে ঝগড়া করিস?

মেয়েটার সন্দেহ কাটেনি। তবে সে হতবাক হয়ে গিয়েছে। আমি এতোকিছু জানি কি করে ! সে অবাক হচ্ছে কিন্তু বিশ্বাস করতে পারছে না যে আমি রবি। আমি আবার বললাম,
: তোর কী হয়েছে? কথা বলিস না কেনো? বোন,তুমি কারো মায়ায় পড়েছো? তাহলে বুঝতে হবে তোমার প্রথম মৃত্যু হয়ে গেছে। তুমি লাশ হয়ে গেছো। ভালোবাসার পর মানুষকে আর মানুষ বলা যায় না। বলতে হয় জীবন্ত লাশ। বেচারী এবার আরো অবাক হয়ে গেলো,চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে। সত্যিই বোধহয় কারো প্রেমে পড়েছে।

ভাবছে আমি এসব জানি কেমন করে। আমিতো এমনিই বললাম। বোধহয় অন্ধকারে ঢিল মেরে লেগে গেছে। কিন্তু মেয়েদের সন্দেহ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শক্তিশালী হয়। আমি যে তার পাগলা ভাই রবি না, সেটা তার কাছে স্বচ্চ জলের ন্যায় পরিস্কার। আর আমার জ্ঞানি জ্ঞানি কথা শুনে বাবা নামের লোকটি এবং পেট মোটা আঙ্কেলটাও কিছু আঁচ করতে পেরেছেন। মেয়েটা তার মাকে বললো………. (চলবে)
-লেখনঃআয়শা মুমিন