• আজঃ শনিবার, ১১ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

কাতারের সুচিকিৎসায় নবজীবন ফিরে পেলেন বাংলাদেশি প্রকৌশলী

 

কাতার প্রতিনিধি-খান জয়


বাংলাদেশের প্রকৌশলী বশির আহাম্মদ আমিন গত এপ্রিল মাসে দোহায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন ।
এটা তারই গল্প।করোনা ভাইরাস থেকে কাতারে তিনি কি করে সেরে উঠলেন, সেটা তিনি বলেছেন নিজের জবানিতে। আইলাভকাতার দোহাভিত্তিক একটি অনলাইন নিউজসাইট। সেখানে ১১ মে প্রকাশিত তার সেই গল্পের অবিকল তরজমা তুলে ধরা হলো :

সম্প্রতি করোনা ভাইরাস থেকে উদ্ধার পাওয়াদের একজন আমি। আমি আমার সেই গল্প আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই । আমি এ নিয়ে লিখছি, যাদের কাছে আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। তাদের জন্যই এই লেখা। সর্বোপরি আমি মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ ।

২০১৪ সালে আমি আমার পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ থেকে কাতারে চলে এলাম। লক্ষ্য ছিল কাহরামায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি নেয়া । প্রথম এখানে যখন কোভিড–১৯ এর প্রকোপের খবর চাউর হয়, আমি সরকার এবং জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ অনুসরণ করি । ১৫ মার্চ ২০২০ আমার সব অফিস মিটিংগুলো স্থগিত করে দেই। আমি বাড়ি থেকে কাজ চালিয়ে যাই ।

গত এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে আমি হালকা জ্বর অনুভব করতে শুরু করি । ভাবলাম শুধু সাধারণ জ্বর, তাই বাড়িতেই বিশ্রাম নেয়ার সিদ্ধান্ত নেই । কিছুদিন পর জ্বর চলে গেল, কিন্তু তার পরেই আমার কাশি শুরু হয়। এটা ক্রমাগত বাড়ে এবং বেদনাদায়ক হয়ে পড়ে। আমি বেশ কয়েক বার বমি করি । এই সময়ে আমি একজন ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। যিনি আমাকে অবিলম্বে হামাদ জেনারেল হাসপাতালে রেফার করেন। সেদিনই আমি সেখানে ভর্তি হয়েছিলাম ।

হামাদ জেনারেল হাসপাতালে তারা আমার একটি এক্সরে করে। এবং করোনা ভাইরাস পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে । ডাক্তারারাও আমাকে আইসোলেশনে রাখেন। ফলাফলে দেখা গেল, আমি করোনা ভাইরাস এর জন্য পজিটিভ। এরপর চিকিৎসা শুরু করার জন্য আমাকে হাজম মেবাইরেক জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় ।

এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পর হাসপাতালে আমার শারীরিক অবস্থার উন্নতি ঘটেছিল । এটা শুধুমাত্র সময়মত এবং সঠিক রোগ নির্ণয়ের কারণে সম্ভব হয়েছিল। ডাক্তার এবং নার্সদের কাছ থেকে আমি নিবিড় মনোযোগ পেয়েছি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোভিড–১৯ নিরাময়ের দক্ষ ব্যবস্থাপনাও সহায়ক ছিল। আমি যখন হাসপাতালে ছিলাম, আমার দুই ভালোবাসার সন্তান এবং আমার প্রিয় স্ত্রীর কাছ থেকে করোনা ভাইরাসের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল । আমরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি, কারণ তাদের সবার ফল নেতিবাচক এসেছিল।

আমার অবস্থার উন্নতি হতে থাকলে আরও পরীক্ষা সম্পন্ন হল এবং আমাকে উমক্বারনে একটি সঙ্গনিরোধ স্থাপনায় স্থানান্তর করা হয়। উম ক্বারনে এক সপ্তাহ অবস্থানকালে সেখানে আমার আরো পরীক্ষা চলে। আমার অবস্থার ব্যাপক উন্নতি ঘটে।

অবশেষে, ২০২০ সালের ২৯ এপ্রিল এল। যখন আমি একজন সুস্থ ব্যক্তি হিসেবে হাসপাতাল থেকে মুক্তি পাই। এদিন আড়াইটায় আমার বাসায় পৌঁছলাম। এটা আমার জন্য নতুন জন্মের মতো লাগছে । আমি বর্তমানে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ১৪ দিন সতর্কতামূলক হোম কোয়ারেনন্টিনে আছি।চিকিৎসার সময় আমার কিছু অনুভূতি আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই ।

হাসপাতালবাসের প্রতিটি ধাপ ছিল অনবদ্য। হামাদ মেডিক্যাল কর্পোরেশনের (এইচএমসি) লোকজন আমাকে যে চিকিৎসাসেবা ও আন্তরিকতা দিয়েছেন, তা ছিল খুবই দক্ষ ও প্রীতিকর । আমি তাদের সেবায় মুগ্ধ। একজন প্রবাসী হিসেবে কখনোই আমি যেন মনে করতে পারিনি যে, আমি এ দেশে বহিরাগত । আমি নিজের ভাষায় প্রকাশ করতে অক্ষম যে, হাসপাতালের সবাই আমার অবস্থার প্রতি কতটা যত্নশীল ও মনোযোগী ছিলেন ।

ডাক্তার, নার্স, অফিসের কর্মী এবং সংশ্লিষ্ট সবাই ছিলেন অমায়িক এবং অসাধারণ । একটি মুহুর্তের জন্য আমার মনে হয়নি যে, একজন কোভিড–১৯ রোগী হিসাবে আমি প্রয়োজনীয় মনোযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলাম। একবার আমাকে উম ক্বারনে সরানো হয়, তখনও আমাকে সময়মত এবং সুস্ঠু পদ্ধতিতে খাদ্য, বস্ত্র, ঔষধ এবং অন্যান্য দৈনন্দিন চাহিদা সামগ্রী পূরণ করা হয় ।

“আমি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে কিছু গুজব ও গসিপ শুনেছি যে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রবাসী রোগীরা কাতারে ততোটা মানবিকভাবে চিকিৎসা পাচ্ছে না । একজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে বলতে পারি, আমি এতটাই সুচিকিৎসা ও সহৃদয়তার পরিচয় পেয়েছে, সেজন্য অনেক কৃতজ্ঞ। সত্যি বলতে কী, এর সবটা আমি যে কোনো কথায় বা লেখায় প্রকাশ করতে পারি না ।

আজ আমার সুস্থতা ও স্বাস্থ্য, শুধু সম্ভব হয়েছে আল্লাহর অসীম করুণার কারণে, তাঁর অসীম রহমত ও দয়ায় । আর এইচএমসি-র সময়োপযোগী ও কার্যকর চিকিৎসা ও পরিষেবার জন্য । আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। যাঁরা আমার আরোগ্য কামনায় দোয়া করেছেন এবং আমার জন্য প্রার্থনা করেছেন, যাঁরা আমার ও আমার পরিবারের পাশে এসেছিলেন, তাঁদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমাকে এটাও পুনরুল্লেখ করতে হবে যে, কাতার সরকারের সুপ্রশাসন ও সুব্যবস্থাপনার অধীনে পরিচালিত হাসপাতালে সেবা লাভ ছিল বড় ঘটনা। যারা আমাকে যথাসময়ে যথা চিকিৎসা ও পরিষেবা দিয়ে ভাল হতে সাহায্য করেছেন, তাঁদের প্রতি ধন্যবাদ ও অশেষ শুকরিয়া জানাই ।

আমি সেইসঙ্গে গভীর কৃতজ্ঞচিত্তে ধন্যবাদ জানাব, সেই মহান ও জ্ঞানী নেতৃত্বের অধিকারী মহামান্য আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির প্রতি। কারণ তিনি তার সুমহান ও বিজ্ঞ নেতৃত্ব দিয়ে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সর্বোত্তম চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছেন। আমি আমার পরিবারের সদস্য, আমার স্ত্রী ও সন্তানদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও আমার প্রতি তাদের নিরন্তর ‘ দোয়ার কথাও না বললে নয়। তাদেরকে ধন্যবাদ।

পরিশেষে, আমি অনুরোধ করতে চাই যে, সবাই যেন কোভিড–১৯ এর কবল থেকে মুক্তি পেতে কাতার সরকারের নির্দেশাবলী অনুসরণ করেন। এবং, যদি কোন কারণে আপনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হন, তাহলে ডাক্তারের নির্দেশাবলী অনুসরণ করুন এবং দুশ্চিন্তামুক্ত থাকুন । ইনশাল্লাহ আপনার আরোগ্য অনিবার্য ।নিশ্চয় সব কিছু ভাল হবে । সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে ।