• আজঃ বুধবার, ১৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

মিরসরাইয়ে পাহাড়ি ঝর্ণায় মৃত্যুর মিছিল থামছে না

মিরসরাইয়ে পাহাড়ি ঝর্নাগুলোতে মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে। পর্যটকদের অসতর্কতার কারণে ঝরে যাচ্ছে তরতাজা প্রাণ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড টাঙানো হলেও তা মানছেনা কেউ। গত ৫ বছরে ১১ জন পর্যটক নিহত ও শতাধিক পর্যটক আহত হয়েছে। একটু সাবধানতা অবলম্বন করলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। করোনার কারণে প্রায় ৪ মাস ঝর্নাগুলোতে পর্যটক যাওয়া নিষিদ্ধ থাকলে গত ১৫দিন ধরে উন্মুক্ত করে দেয়ায় ঢল নেমেছে ভ্রমন পিপাসু মানুষের।

জানা গেছে, সারা দেশের ভ্রমন পিপাসু মানুষের কাছে ঝর্নার জন্য সুপরিচিত নাম এই জনপদ। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঝর্ণা দেখার জন্য মিরসরাইয়ে আসছেন পর্যটকরা। বিশেষ করে সপ্তাহে ছুটির দিনে পর্যটকদের ঢল নামে এসব ঝর্নায়। উপজেলার খইয়াছড়া, নাপিত্তাছড়া সহস্রধারা, মহামায়া, বাওয়াছড়া, রূপসী ঝর্ণা, বোয়ালিয়া ঝর্না, হরিণাকুন্ড ঝর্না, সোনাইছড়ি ঝর্ণা নজর কেড়েছে ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের।

সর্বশেষ গত ৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে উপজেলার খইয়াছড়া ইউনিয়নের দশ স্তর বিশিষ্ট খইয়াছড়া ঝর্ণার উপর থেকে নীচে পড়ে যান ফয়েজ আহমেদ খাজু (৩৯)। তিনি ফেনী পৌরসভার বারাহীপুর গ্রামের মো: ইদ্রিসের ছেলে। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় নিহতের লাশ পাহাড়ের গভীর থেকে উদ্ধার করা হয়। তিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী।

গত বছরের ১৫ আগস্ট উপজেলার বড়কমলদহ রূপসী ঝর্নায় কূপে ডুবে নিহত হয় মেহেদী হাসান প্রান্ত (২১)। মেহেদী হাসান নাটোর জেলার নাটোর উপজেলার জালালাবাদ গ্রামের মোঃ নুরুল আমিনের ছেলে। একই বছরের ২৬ জুলাই খইয়াছড়া ঝর্ণা দেখতে এসে ঝর্ণার উপর থেকে পা পিছলে পড়ে নাম আবু আল হোসাইন মেমোরী (২৯) নামে এক পর্যটক নিহত হয়।

তার বাড়ী বগুড়া জেলার বগুড়া সদর থানায়। সে ঢাকার টিকাটুলি এলাকায় সেইফটি কনসালটেন্ট বিডি প্রতিষ্ঠানের আর্কিটেকচার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতো। ২৮ জুন খইয়াছড়া ঝর্নায় আনোয়ার হোসেন নামে এক পর্যটক উপর থেকে পড়ে নিহত হয়। সে ফেনী সদরের আব্দুল মজিদের ছেলে। গত ২ এপ্রিল খইয়াছড়া পাহাড়ি এলাকায় ঝর্ণার উপর থেকে পা পিছলে পড়ে মো. আশরাফ হোসেন (৩০) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে।

নিহত আশরাফ ফটিকছড়ি উপজেলার জাফরনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মৃত নাজিম উদ্দিনের সন্তান। ১৭ জুলাই মহামায়া লেকে পানিতে ডুবে নিখোঁজ হয় শাহাদাত হোসেন (২২) নামে এক যুবক। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ১৯ জুলাই পানিতে খুঁজে শাহদাতকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। তার বাড়ী মিরসরাই উপজেলার সদর ইউনিয়নে।

২০১৮ সালের ১৫ আগস্ট নয়দুয়ারিয়ার নাপিত্তাছড়া ঝর্ণার কূপে ডুবে অনিমেষ দে (২৭) নামে এক পর্যটক নিহত হয়। সে ফকিটছড়ি উপজেলার নিরঞ্জন দে’র ছেলে। একই বছরের ২৪ আগস্ট বড়কমলদহ রূপসী ঝর্ণায় উপর থেকে পড়ে গিয়ে মারা যায় সাইফুল ইসলাম নামে এক যুবক। তার বাড়ি সীতাকুন্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া এলাকায়।

২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর উপজেলার নাপিত্তছরা ঝর্ণায় সাঁতার কাটার সময় চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন মামুন (২২) মৃত্যু হয়। সে ফেনী সদর উপজেলার শর্শদী এলাকার মতিউর রহমানের ছেলে।

জানা গেছে, কিছু বিষয়ে সতর্ক না থাকায় অনেক সময়ই ঘটে যাচ্ছে দুর্ঘটনা। তাই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহ বেশ কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন মিরসরাই উপজেলা ও থানা প্রশাসন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া খেয়ালখুশি মতো গহীন জঙ্গলসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে এলোমেলোভাবে বেড়াতে গিয়ে ছিনতাইয়ের কবলে পড়ছে। এর জন্য অনেকেই দর্শনার্থীদের দায়িত্বহীনতা ও অসংযত আচরণকে দায়ী করছেন।

খইয়াছড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জাহেদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, মূলত দায়িত্বহীনতা ও অসাবধানতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। অনেকে ঝর্ণার উপরে উঠে সেলফি তুলতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যায়। আমি ঘুরতে আসা পর্যটকের বিনীত অনুরোধ করবো প্লিজ আপনার সতর্ক হোন। নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলবেন না।

মিরসরাই ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স এর ষ্টেশন অফিসার মো: তানভির আহম্মদ বলেন, ঝর্নাগুলোতে প্রশসনের নজর দেয়া প্রয়োজন। পর্যটকদের গাইড দিতে হবে কোন স্থানে গেলে দুর্ঘটনা ঘটবে, কোন স্থানে গেলে নিরাপদ তাহলে দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে।

মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, মিরসরাইয়ের বিভিন্ন পাহাড়ে সৃষ্ট ঝর্ণা দেখতে ছুটে আসেন শত শত পর্যটক। আমরা পর্যটকদের সতর্ক করে সাইনবোর্ডে অনেক নির্দেশিকা লিখে দিয়েছি। পাশাপাশি গাইড এর ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু পর্যটশরা নির্দেশনা মানছে না। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে। আমরা আবারো উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দুর্ঘটনায় নিহত পর্যটকদের ছবি দিয়ে শীঘ্রই সর্তকতামূলক সাইনবোর্ড টাঙাবো।