• আজঃ শনিবার, ১১ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

প্রধানমন্ত্রীর ২হাজার ৫ শ টাকা সহায়তা হবিগঞ্জের ৩ টি ইউনিয়নে গলদ, তদন্ত কমিটি গঠন

সৈয়দ মোঃ রাসেল(হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি:


প্রধানমন্ত্রীর ২ হাজার ৫শ’ টাকা সহায়তা খসরা তালিকায় গলদ ধরা পড়েছে আরও দুইটি ইউনিয়ন। সেগুলো হচ্ছে লাখাই উপজেলার মুড়াকরি ও বুল্লা ইউনিয়ন। প্রায় একই রকম গলদ ধরা পড়েছে সেগুলোতেও। এর আগে ধরা পড়ে মুড়িয়াউক ইউনিয়নে। এ ৩টি ইউনিয়নে গলদ তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মো. নূরুল ইসলামকে একমাত্র সদস্য করে এ কমিটি গঠন করা হয়। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান শনিবার এ কমিটি করেন। তাকে আগামী ৩ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। ইতিমধ্যেই তিনি তদন্ত শুরু করেছেন। একই সাথে নতুন তালিকা তৈরী করে দিতে ইউনিয়নগুলোতে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড মেম্বার, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের দিয়ে পৃথক কমিটি করা হয়েছে। তাদেরকে রোববার নতুন তালিকা তৈরী করে জমা দিতে বলা হয়েছে। তালিকায় গলদ হওয়া ইউনিয়নগুলো হচ্ছে লাখাই উপজেলার মুড়িয়াউক, মুড়াকরি ও বুল্লা।

এ তথ্য নিশ্চিত করে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শিক্ষা ও আইসিটি মর্জিনা আক্তার জানান, প্রত্যেকের ভোটার আইডি ও মোবাইল ফোন নাম্বার যাচাই পূর্বক তালিকা পূনরায় করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। উপজেলা চেয়ারম্যান বিষয়টি তদারকি করবেন। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানদের বুঝা উচিৎ ছিল যে তালিকায় গলদ থাকলে টাকা পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। এটি সফটওয়ার নেবেনা। এনআইডি ও মোবাইল ফোন নাম্বার অনুযায়ী তালিকা সঠিক না হলে একটি টাকাও কেউ পাবেনা। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। তিনি তালিকায় গলদের বিষয়টি শোনার সাথে সাথেই তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। একই সাথে পূণরায় তালিকা তৈরী করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

লাখাই উপজেলা চেয়ারম্যান মো. মুশফিউল আলম আজাদ জানান, তদন্ত কমিটি হয়েছে। তিনি ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করে দিয়েছেন। রোববার নতুন করে তালিকা তৈরী করে দেয়ার জন্যও ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কমিটি করা হয়েছে। তারা যাচাই বাছাই করে সংশোধিত তালিকা তৈরী করে দেবেন।

উল্লেখ্য, লাখাই উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে ৬ হাজার ৭২০টি পরিবার নগদ ২ হাজার ৫শ’ টাকা করে সরকারি অর্থ সহায়তা পাবেন। এর মধ্যে লাখাই ইউনিয়নে ১ হাজার ১৯৪ জন, মোড়াকরি ইউনিয়নে ১ হাজার ১১৩, মুড়িয়াউক ইউনিয়নে ১ হাজার ১৭৬, বামৈ ইউনিয়নে ১ হাজার ২৪৬, করাব ইউনিয়নে ১ হাজার ৬ ও বুল্লা ইউনিয়নে ৯৮৫ জন। এর প্রেক্ষিতে প্রতিটি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা উপজেলা প্রশাসনের কাছে খসড়া তালিকা জমা দেন। প্রায় প্রতিটি তালিকায়ই মারাত্মক ঘাপলা ধরা পড়ে। এর মাঝে সবচেয়ে বেশি ঘাপলা ধরা পড়ে মুড়িয়াউক, মুড়াকরি ও বুল্লা ইউনিয়নে। দেখা যায় একটি মোবাইল নাম্বার একাধিক ব্যক্তির নামের পাশে, একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি এবং অধিকতর স্বচ্ছ্বল পরিবারও এ তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন। এমন ঘাপলা ধরা পড়ার সাথে সাথেই নড়ে চড়ে বসে উপজেলা প্রশাসন। সে অনুযায়ী যাচাই বাছাই শুরু করে।

চেয়াম্যানের দেয়া তালিকায় পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, মুড়িয়াউক ইউনিয়নের নগদ টাকা পাওয়ার তালিকায় ১ হাজার ১৭৬ জনের নাম রয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম মলাই মিয়ার নিকটাত্মীয় আনোয়ারের মোবাইল ০১৯৪৪৬০৫১৯৩ নাম্বার ব্যবহার করা হয়েছে ৯৯ জনের নামের বিপরীতে। চেয়ারম্যানের চাচাতো ভাই আক্তার মিয়ার ০১৭৪৪১৪৯২৩৪ নাম্বার ৯৭ জনের এবং চাচা শাকিল হকের ০১৭৮৬৩৭৪৩৯১ নাম্বার ৬৫ জনের নামের পাশে ব্যবহার করা হয়েছে।

চেয়ারম্যানের আরেক নিকটাত্মীয় নবীর মিয়ার ০১৭৬৬৩৮০২৮৪ নাম্বার দেয়া হয়েছে ৪৫ জনের নামে। ১০/১২ জন করে নাম ব্যবহার করা হয়েছে অন্তত ৩০টি নাম্বারে। ৩০/৩৫টি নাম্বার একাধিক নামের সাথে প্রদান করা হয়েছে। ওই ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে কোনো হিন্দু পরিবারের বসবাস না থাকলেও তালিকার ৯৫৮, ৯৬৫ ও ৯৭৩ সিরিয়ালের তিনটি নাম হিন্দু ব্যক্তির। আবার ওই ইউনিয়নের সম্পদশালী আক্কল আলীর ছেলে সাহাব উদ্দিনে নামও তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। তালিকার ১৬১ ও ১৬৩ নাম্বারে স্বামী-স্ত্রী দু’জনের নাম দেয়া হয়েছে। তালিকার ৯৫১, ৮৫৫, ৮৫৩, ৮৫২, ৮৫১ ও ৭৮৪ নাম্বারের ছয়জন একই পরিবারের সদস্য। কেঁচু খুড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসতে শুরু করে। এ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গিয়ে আরও অনেক নতুন তথ্য সামনে আসে। ঘাপলা ধরা পড়ে মুড়াকরি ও বুল্লা ইউনিয়নেও। সেখানেও একাধিক নামের বিপরীতে একটি মোবাইল নাম্বার ব্যবহার করা হয়। একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তিকে তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়। চেয়ারম্যানদের স্বজন ও অনেক বিত্তশালীদেরও এসব তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এর প্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মো. নূরুল ইসলামকে সদস্য করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন জেলা প্রশাসন মোহাম্মদ কামরুল হাসান।

উল্লেখ্য, করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে কর্মহীন হয়ে পড়া দিনমজুর ও শ্রমজীবীদের জন্য নগদ অর্থ সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ৫০ লাখ পরিবার আড়াই হাজার টাকা করে সহায়তা পাবেন।