• আজঃ মঙ্গলবার, ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাকিম সরকারের ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত আব্দুল হাকিম সরকার (১৯২০-১৯৮১) বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত (বর্তমান শেরপুর জেলা) রূপনারায়নকুড়া ইউনিয়নের নিজপাড়া গ্রামে ঐতিহ্যবাহী সরকার পরিবারে ১৯২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। মরহুম হাজী তমির উদ্দিন সরকারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে জ্যৈষ্ঠ সন্তান ছিলেন আব্দুল হাকিম। বাল্যকাল থেকেই তিনি মা-মাটি-মানুষের হৃদয়স্পর্শী বালক ছিলেন। বিনয়ী,সাদাসিধে,নিরহংকারী মাটির মতো মানুষ। ঐতিহ্যবাহী রুপনারায়নকুড়া প্রাইমারী স্কুল থেকে সরকারি বৃত্তি সহ প্রাইমারি পাশ করেন। তারপর জামালপুর সরকারি হাই স্কুল থেকে এস.এস.সি পাশ করেন এবং আনন্দ মোহন কলেজ থেকে বি.এস.সি পাশ করেন।

আনন্দ মোহন কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় রাজনীতিতে সক্রিয় ভাবে জড়িয়ে পড়েন। তিনি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, রফিক উদ্দিন ভূইয়া প্রমুখ উনাদের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা হয়ে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম উনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।একই গ্রামের তালুকদার বংশের মেয়ে সাহের বানুর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ্য হন। তিনি সাংসারিক জীবনে তিন পুত্র ও আট কন্যা সন্তানের জনক। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ গঠনের পরে রাজনীতির অঙ্গনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান,মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে সুসম্পর্ক ছিল। নালিতাবাড়ীতে যখন বিদ্যা,বুদ্ধি এবং সচেতন লোকের অভাব ছিল ঠিক ওই সময় পাকিস্তান আমলে অবহেলিত নালিতাবাড়ীতে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসেন আ:হাকিম সরকার। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠালগ্নে নালিতাবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।

শিক্ষকতা দিয়ে কর্ম জীবন শুরু করেন। সেটা ছিলো চুক্তিভিত্তিক। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হলেন আব্দুল হাকিম সরকার । ১৯৫৪ সালের ৮ ই মার্চ থেকে ১২ ই মার্চে অনুষ্ঠিত হলো যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন।শেরপুর-২ (নকলা, নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতী) আসনে নৌকা মার্কায় বিপুল ভোটে M.L.A (Member of Legislative Assembly) নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর। পাকিস্তান জন্মের ২৩ বছর পর প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো জাতীয় নির্বাচন। নকলা,নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতীর আংশিক নিয়ে যে আসন সেই আসন থেকে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন পান আ: হাকিম সরকার। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে M.N.A (Member of National Assembly) নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধুত্বে পরিনত হয়েছিলো ভারতের মেঘালয় রাজ্যে। একদিকে আশ্রয় দিয়েছে বিপুল শরণার্থীকে অন্যদিকে মেঘালয় পরিণত হয়েছিল মুক্তিফৌজের প্রশিক্ষণের অন্যতম কেন্দ্র।আমপাতি ভারতের একটি গ্রাম। ১৯৭১ সালে এটি হয়ে উঠেছিল মিনি বাংলাদেশ। পাকিস্তান বাহিনীর নির্যাতন থেকে বাঁচতে ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর ও নেত্রকোনার বহু মানুষ আশ্রয় নেয় ভারতের মেঘালয় রাজ্যে।

আব্দুল হাকিম সরকার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য মেঘালয়ে অবস্থান নেন। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা কমিটিতে দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময় মেঘালয়ে কুদরত উল্লাহ মন্ডল (হালুয়াঘাট), শামসুল হক (ফুলপুর), মোশাররফ হোসেন (ফুলপুর), হাতেম আলী (টাঙ্গাইল) প্রমুখদের সাথে অবস্থান করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ১০ ই আগষ্ট (২৬ শে শ্রাবণ) রোজ: মঙ্গলবার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কালাপাগলার জৈনক এক রাজাকার ও স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় হাকিম সরকারের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করতে আসেন। বাড়িতে ঢুকে তারা এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। আবুল হাসেম নামে একজন আহত হয়। তারপর হাজী ওমর উদ্দীন সরকারের বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেয় হানাদার বাহিনী। মূলত পুড়িয়ে দেওয়া কথা ছিলো আব্দুল হাকিম সরকারে বাড়ি। দ্বিতীয়বার আজগর খানের নেতৃত্বে হাকিম সরকারের বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেয় স্থানীয় রাজাকার ও পাকিস্তান আর্মি। ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীর যৌথ নেতৃত্বে পাক হানাদার বাহিনীর দখল থেকে শেরপুর জেলা মুক্ত হয়। গৌরবগাঁথা সেই দিনটির কথা শেরপুর বাসীর স্মৃতিতে আজও ভাস্বর হয়ে আছে। ১৪ ডিসেম্বর আব্দুল হাকিম সরকার মেঘালয় থেকে নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। ১৬ ডিসেম্বর ত্রিশলাখ শহীদ এবং তিন লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে আসার পর ১১ জানুয়ারি ধানমন্ডির ৩২ নাম্বারে দেখা করতে বাসায় যান আব্দুল হাকিম সরকার ও উনার বড় ছেলে মোস্তফা কামাল।বঙ্গবন্ধু আবেগাপ্লুত হয়ে উনাকে বুকে জরিয়ে ধরেন।জাতির জনক মোস্তফা কামালের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আশীর্বাদ করেন। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠালগ্নে আব্দুল হাকিম সরকার কে শেরপুর জেলার ডেপুটি গর্ভণর নিয়োগ করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট শেখ মুজিবুর রহমান ও উনার স্বপরিবার হত্যার পর বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী হত্যার প্রতিবাদ সরূপ প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। যাদেরকে কাদেরিয়া বাহিনী বলা হতো। সেই কাদেরিয়া বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে আব্দুল হাকিম সরকার এবং উনার বড় ছেলে মোস্তফা কামালকে জামালপুর অস্থায়ী আর্মি ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে উনাদের কে মানসিক নির্যাতন করেন এবং তিন দিন আটকে রাখেন। সেই বর্বরতার প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিরোধ যোদ্ধা হায়দার আলী। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ রক্ষার্থে অত্যান্ত নিষ্ঠার সাথে মৃত্যুর আগ মূহুর্ত পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং নালিতাবাড়ী উপজেলা আওয়ামীলীগ কে সংগঠিত করে তুলেন। এ জন্য উনাকে আমৃত্যু সভাপতি বলা হয়।

তখনকার সময়ে আব্দুল হাকিম সরকারের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ডাঃ আব্দুল হামিদ, হাজী নুরূল হক, আঃ রশিদ, শরাফ উদ্দিন, মেহের আলী সরকার প্রমুখ। তিনি অবিভক্ত ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামীলীগের সদস্য ছিলেন। তিনি রাজনৈতিক নেতা,সমাজ সেবক, শিক্ষানুরাগী হিসাবে বেশ সুনাম অর্জন করেন। ১৯৮০ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হন৷ দীর্ঘ এক বছর শয্যাশায়ী থাকেন। পরিশেষে, ১৯৮১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর রোজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১.০০ টায় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। উনার মৃত্যুতে ৬১ বছরের বর্নাঢ্য জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। এই গুনী মানুষটির ৩৯ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

-লেখকঃ মো: আদনান হোসাইন সরকার

নিজপাড়া, নালিতাবাড়ী, শেরপুর।

সাবেক এম.এল.এ এবং এম.এন.এ বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আব্দুল হাকিম সরকার বৃহত্তর ময়মনসিংহের গর্ব। উনি সম্পর্কে আমার বড়বাপ (বাবার দাদা)। আমার পরিবার (দাদা, চাচা, বাবা) ও নালিতাবাড়ীর শ্রদ্ধাভাজন গুণিজনের কাছে মরহুম আব্দুল হাকিম সরকার সম্পর্কে শুনাগুলো আমার লেখায় তুলে ধরলাম।