• আজঃ বুধবার, ১৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

একজন প্রধান মন্ত্রী ও করোনা ভাইরাস ; প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব-১

 

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী নোভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মহামারী আকার ধারণ করেছে। কোভিড-১৯-এর করাল থাবায় বিশ্ব আজ লণ্ডভণ্ড। সারা বিশ্বে দুই লাখের বেশি মানুষ ইতোমধ্যে মারা গেছে।

খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঠেকাতে পারছে না তাদের মৃত্যুর মিছিল। করোনার হিংস্রতায় ইউরোপ ছিন্নভিন্ন। বিগত একশ’ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এ সংকটে বিশ্বের তাবৎ উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হতভম্ব! দিশেহারা বিশ্ববাসী!

ঘনবসতিপূর্ণ ১৬ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে করোনাভাইরাস মোকাবেলা করা অন্যান্য দেশের চেয়ে ভিন্নতর। অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল মানুষের কাছে একদিকে যেমন ত্রাণ পৌঁছে দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে আগাম বন্যার আগেই হাওরের ধান যথাসময়ে কাটার ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ শৃঙ্খল রাখতে হচ্ছে স্বাভাবিক।

আবার শিল্পোদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গার্মেন্টকর্মী, পরিবহন শ্রমিক, দিনমজুর, কৃষি শ্রমিক ও রিকশাচালকসহ সবাই যেন তাদের নিজ নিজ ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারে, সেজন্য সরকারকে খাতভিত্তিক প্রণোদনা প্যাকেজ এবং আর্থিক সহায়তা দিতে হচ্ছে।

আক্রান্তদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার পাশাপাশি ত্রাণ বিতরণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী মানুষের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাকে নিশ্চিত করতে হচ্ছে। এজন্য দেশের প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত বহুমাত্রিক কার্যক্রম শুরু করছে সরকার।

এ বিশাল কর্মযজ্ঞের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একজন দক্ষ রাষ্ট্রনায়কের মতো বঙ্গবন্ধুকন্যা গণভবন থেকে দৃঢ় মনোবল নিয়ে প্রতিনিয়ত সার্বিক কার্যক্রম মনিটরিং ও সমন্বয় করে চলেছেন।

গত ডিসেম্বরের শেষে চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয়ার পরপরই দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ‘রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর)’-এ ‘কন্ট্রোল রুম’ খুলে রোগটি মোকাবেলায় প্রস্তুতি শুরু করা হয়।

সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও খোলা হয় ‘কন্ট্রোল রুম’। জানুয়ারি থেকেই দেশের সব বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর এবং স্থলবন্দরে বিদেশ প্রত্যাগতদের থার্মাল স্ক্যানার ও ইনফ্রারেড থার্মোমিটারের মাধ্যমে স্ক্রিনিং করা হয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় কমিটি এবং বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও কমিটি গঠিত হয়েছে। সংগ্রহ করা হয়েছে পর্যাপ্ত পিপিই এবং টেস্টিং কিটস। বর্তমানে দেশব্যাপী ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোয় কোভিড-১৯ রোগের পরীক্ষা এবং চিকিৎসা সুষ্ঠুভাবে চলছে।

রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার সময়োচিত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে এখনও বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণ ঘটেনি এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ৮ মার্চ দেশে যখন প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়, সেদিনই গণভবনে তৎক্ষণাৎ সভা ডেকে ‘মুজিববর্ষ’-এর সব অনুষ্ঠান স্থগিত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জনকল্যাণের কথা চিন্তা করে জাতির পিতার কন্যা বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি দীর্ঘদিনের আরাধ্য বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানমালা স্থগিত করতে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়।

২৬ মার্চ থেকে অফিস-আদালতে সাধারণ ছুটি বলবৎ রয়েছে। জরুরি সেবা কার্যক্রম ছাড়া সবকিছু বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দেশের সিংহভাগ শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে। স্থগিত রয়েছে গণপরিবহন, রেল ও বিমান চলাচল।

৩১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের ৬৪টি জেলার জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন দফতরের মাঠপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে একযোগে ভিডিও কনফারেন্সে গণভবন থেকে সরাসরি কথা বলেন। এরপর পর্যায়ক্রমে বিভাগওয়ারি প্রতিটি জেলার সঙ্গে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে চলমান কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে ভিডিও কনফারেন্স চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয়

জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তিনি প্রান্তিক পর্যায়ের খোঁজখবর নেন, সমস্যা জানতে চান এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। সবাইকে তিনি অবিরাম সাহস জুগিয়ে আÍবিশ্বাসী করে তুলছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৬৪ জেলায় কোভিড-১৯ প্রতিরোধ ও ত্রাণ বিতরণসহ সার্বিক কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে সরকারের ৬৪ জন সিনিয়র সচিব/সচিবকে দায়িত্ব দিয়েছেন। জাতির এই ঘোরতর সংকটে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের একটি জেলার সমন্বয়ের দায়িত্ব দিয়ে তিনি একজন বিচক্ষণ সরকারপ্রধানের মতো কাজ করেছেন।

লকডাউনের কারণে ধান কাটার জন্য কৃষি শ্রমিকের অভাব দেখা দিতে পারে মনে করে জননেত্রী শেখ হাসিনা তার নিজের রাজনৈতিক দল এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ধান কাটার আহ্বান জানান।

নেত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও কৃষক লীগ সফলতার সঙ্গে সারা দেশে ধান কাটা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং আগাম বন্যার আগেই যথাসময়ে পাকা ধান ঘরে তুলতে পারছেন কৃষক।

বিনামূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রয়, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মাঝে অর্থ বিতরণ, বয়স্ক ভাতা ও বিধবা/স্বামী নিগৃহীতদের ভাতার আওতা সর্বাধিক দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকায় শতভাগে উন্নীত করা এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে গৃহীত অন্যতম কার্যক্রম গৃহহীন মানুষের জন্য গৃহনির্মাণ-সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের এই কর্মসূচিগুলো করোনা পরিস্থিতিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।

১০ টাকায় চাল পেতে নতুন ৫০ লাখ রেশন কার্ডসহ এক কোটি রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে এক কোটি পরিবারের ৫ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে।

২৬ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ৬৬ কোটি ২৭ লাখ টাকার নগদ সহায়তা এবং এক লাখ ২৩ হাজার ৮৬৭ টন খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেয়া হয়েছে নিু আয় ও কর্মহীন মানুষের মাঝে। এছাড়া জরুরি শিশুখাদ্য সহায়তাও পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।

ডাইনামিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্ভাব্য অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় ইতোমধ্যে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, যা জিডিপির ৩.৫ শতাংশ। পোশাক শ্রমিকদের শতভাগ বেতন নিশ্চিত করতে তিনি পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন।

তাছাড়া কৃষি ও কৃষকের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছেন তিনি। আগামী বাজেটে ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বোরো মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ ২১ লাখ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে কৃষকের কাছে বীজ, সার, কীটনাশক ও যন্ত্রপাতি সহজলভ্য করার যাবতীয় নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সম্মুখসারির যোদ্ধা চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রত্যক্ষভাবে করোনা আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে কাজ করা স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষ পুরস্কার ও প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন তিনি। এজন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ

ছাড়া এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে ডাক্তার, সব ধরনের স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সশস্ত্র বাহিনী ও বিজিবি সদস্য এবং প্রত্যক্ষভাবে নিয়োজিত প্রজাতন্ত্রের অন্য কর্মচারীদের জন্য বিশেষ বীমা ব্যবস্থা করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

দায়িত্ব পালনকালে যদি কেউ আক্রান্ত হন, তাহলে পদমর্যাদা অনুযায়ী প্রত্যেকের জন্য থাকছে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার স্বাস্থ্যবীমা এবং মৃত্যুর ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ৫ গুণ বৃদ্ধি পাবে। স্বাস্থ্যবীমা ও জীবনবীমা বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭৫০ কোটি টাকা।

এই চরম দুঃসময়েও বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর কথা ভোলেননি মাদার অব হিউম্যানিটি শেখ হাসিনা। সার্বিক পরিকল্পনায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরও তিনি অন্তর্ভুক্ত করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ-বাণিজ্যবিষয়ক সাময়িকী ফোর্বসে সম্প্রতি প্রকাশিত এক নিবন্ধে করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবেলায় দ্রুততার সঙ্গে সঠিক পদক্ষেপ নেয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করা হয়েছে।

কানাডিয়ান লেখক অভিভাহ ভিটেনবার্গ-কক্স তার এ নিবন্ধে লিখেন- ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৬ কোটি ১০ লাখের মতো মানুষের দেশ বাংলাদেশ সমস্যা-সংকটের সঙ্গে অপরিচিত নয়। তিনি এই সংকট মোকাবেলায় দ্রুত সাড়া দিয়েছেন, যাকে ‘প্রশংসনীয়’ বলেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম।’

আন্তর্জাতিক সাপ্তাহিক নিউজপেপার দ্য ইকোনমিস্ট করোনা পরিস্থিতিতে অর্থনীতির নিরাপত্তা নিয়ে অতি সম্প্রতি যে গবেষণা তালিকা প্রকাশ করেছে, সেখানে দেখা যায়, ভারত-চীন থেকেও নিরাপদ বাংলাদেশের অর্থনীতি।

নিঃসন্দেহে বলতেই হবে, সম্মানজনক এসব অর্জনে যিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি হলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছেন আজকের পরিপক্ব রাজনীতিবিদ ‘শেখ হাসিনা’। প্রবল দেশপ্রেম এবং গণমানুষের প্রতি তীব্র দায়বদ্ধতা ‘জননেত্রী’ হিসেবে তাকে পরিচিত করেছে। তীক্ষè বুদ্ধিসম্পন্ন অভিজ্ঞ সরকারপ্রধান হিসেবে তাই তো তিনি দ্রুততার সঙ্গে নিতে পেরেছেন একের পর এক সঠিক ও কার্যকর সিদ্ধান্ত। আমেরিকান লেখক জন ক্যালভিন ম্যাক্সওয়েলের ভাষায়-

‘The pessimist complains about the wind.
The optimist expects it to change.
The leader adjusts the sails.’

একজন দক্ষ নেতার মতো ‘sails adjust’ করেই দেশ ও দেশের মানুষকে আশার আলো দেখিয়ে যাচ্ছেন দেশরত্ন শেখ হাসিনা; আবির্ভূত হয়েছেন বাঙালির ‘বাতিঘর’ হিসেবে। এই গভীর সংকটের সময় শেখ হাসিনার মতো একজন সাহসী, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতাকে আমরা দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনে পেয়েছি- এজন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

 


এমএম ইমরুল কায়েস : প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব-১