• আজঃ সোমবার, ১৩ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

সৌদি আরব রঙ্গীন চশমার আড়ালের গল্প

সৌদি আরব বলা যেতে পারে বিশ্বের অন্নতম তেল সমৃদ্ধ ধনী দেশ। এর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানী সৌদি আরামকোর মূল্য অ্যাপল, গুগল কিংবা আমাজনের চেয়ে বেশি। কিন্তু এতো ধন-দৌলত থাকা সত্বেও সৌদির নাগরিক সমাজ শ্রেণিবিভক্ত হয়ে আছে। রাজকীয় পরিবার ও অতি ধনী, মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র—এসব শ্রেণিতে তারা বিভক্ত। সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নিজ নিজ সম্প্রদায়কে তারা আলাদা করে রেখেছে।

সৌদির অন্য অনেক শহরের মতো জেদ্দা শহরও দুই ভাগে বিভক্ত। এই শহরের উত্তর দিকের অংশে থাকেন রাজকীয় পরিবারভুক্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের লোকেরা। দক্ষিণ অংশে থাকেন অভিবাসী শ্রমিক, অবৈধ অভিবাসী এবং মধ্যবিত্ত সৌদি নাগরিকেরা। এ অবস্থা শুধু সৌদি আরবে নয় বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরে ও ভালো ভাবে থাকলে এই চিত্র দেখা যায়।

অনেক সৌদি নাগরিক তাঁদের খাওয়া–পরার খরচ জোগাড় করতে তাঁদের ফেরি করতে হয় । এমনকি অনেক নাগরিকের সন্তানদের অর্থের অভাবে স্কুল থেকে ঝরে পড়তে হয় ।

সৌদিতে অতিদরিদ্রদের জন্য সরকারের দিক থেকে কিছু সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু তা পেতে গেলে যে আমলাতান্ত্রিক পর্যায়গুলো পার হতে হয় তাই এই নিরক্ষর অধিকাংশ নাগরিকের পক্ষে অসম্ভব। এই সহায়তা পেতে গেলে একটি ব্যাংক হিসাব খুলতে হয় । কিন্তু হিসাব খুলতে যে নিম্নতম অঙ্কের অর্থ থাকা দরকার, তা অনেকেরই কাছে থাকে না ।তাই প্রায় ৭০ লাখ সৌদি নাগরিকের কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। এই ৭০ লাখের ৬০ শতাংশের বেশিই নারী।

এই শ্রেণীর নাগরিকদের বস্তিতেই বসবাস করতে হয় । যেখানে স্বাস্থ্যসম্মত পানি কিংবা পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই । বৃষ্টি হলেই ঘরে ড্রেনের পানি ঢুকে পরে । খাবার পানি পাশের কোনো মসজিদের অজুখানা থেকে জোগাড় করতে হয় তাঁদের । এমন অবস্থায় অন্তত ১০ লাখ মানুষ এখন সৌদি আরবে মানবেতর জীবন যাপন করছে অথচ বাকি বিশ্ব তাঁদের বিষয়ে কিছুই জানতে পারে না ।

বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, সৌদির অন্তত ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ এখন দরিদ্র। সরকারই এই দারিদ্র্য দূর করার পথে প্রধান বাধা হয়ে আছে। ক্ষমতাসীনেরা এসব গরিব মানুষের অস্তিত্বই স্বীকার করতে চায় না। যদি তাদের গরিব বলে মেনে নেওয়া হয়, তাহলে বৈষম্য কমানোর দিকে ঝুঁকতে হবে এবং সেটি করতে গেলে ধনীদের ওপর বেশি কর আরোপ করতে হবে। ধনীদের ওপর কর আরোপ করে সরকার তাদের খেপিয়ে তুলতে চায় না।

ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মাদ বিন সালমান দারিদ্র্য কমাতে রূপরেখা ২০৩০ ঘোষণা করেছেন। সেই মতো কাজও করছেন তিনি।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। দরিদ্র আরও দরিদ্র হচ্ছে। মধ্যবিত্তদের ভাগ্য বদল হচ্ছে না। সৌদি আরবে দারিদ্র্য হটানোর মূল উপায় হিসেবে এত দিন নাগরিকদের জাকাতের অর্থকেই ভাবা হতো। সৌদিতে অবস্থাপন্নরা শতকরা আড়াই টাকা জাকাত দিয়ে থাকেন। সেই অর্থ সরকার দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করে। কিন্তু এই পদ্ধতিতে টেকসইভাবে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়। বে দেশটিতে ‘দারিদ্র্য’ শব্দটিই উচ্চারণ কার্যত নিষিদ্ধ করে রেখেছে সরকার। সেখানকার দারিদ্র্য নিয়ে তথ্যচিত্র বানানোর জন্য এ পর্যন্ত অন্তত দুজন মানবাধিকারকর্মীকে জেলে ঢোকানো হয়েছে।

২০১৩ সালে আরব বসন্তের মধ্যে সৌদি আরবে মোহাম্মাদ আল হুরাইসি নামের এক তরমুজ বিক্রেতাকে পুলিশ রাস্তায় তরমুজ বিক্রি করতে না দেওয়ায় নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে আত্মাহুতি দেন। ওই ঘটনার পর সৌদির দারিদ্র্যের খবর কিছুটা জনসমক্ষে আসে।

২০১৫ সালে বাদশাহ সালমান ক্ষমতা নেওয়ার পরপরই তেলের দাম এক ধাক্কায় ব্যারেলপ্রতি এক শ ডলার থেকে ৫০ ডলারে নেমে আসে। সৌদির বাজেটের ৮৭ শতাংশই তেলনির্ভর হওয়ায় দেশটি ভয়ানকভাবে ধাক্কা খায়। এরপরই অর্থনীতিতে তেলনির্ভরতা কমাতে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর কিছু শেয়ার বেসরকারি খাতে ছাড়া হয়েছে। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মাদ বিন সালমান এখন সরকারের রাজস্ব বাড়াতে বহু পণ্যে কর আরোপ করেছেন। মূল্য সংযোজন কর আরোপ করেছেন। এতে দরিদ্ররা তো বটেই, মধ্যবিত্তরাও বিপাকে পড়েছে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। যাঁদের অবস্থা একটু ভালো, তাঁরা ভবিষ্যতে বিপদে পড়ার ভয়ে স্থাবর–অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে বিদেশে চলে যাচ্ছেন।

এ অবস্থায় বৈষম্য কমানোর জন্য সরকারকে সাহসী পথ বেছে নিতেই হবে। ধনিকশ্রেণির ওপর কর বাড়িয়ে গরিব শ্রেণিকে যতটা পারা যায় বাড়তি খরচের হাত থেকে বাঁচাতে হবে।

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া

হানা আল খামরি সুইডেন ভিত্তিক লেখক ও সাংবাদিকের লেখা থেকে কাটশিট।

তাফাজ্জুল তপু

পালেরমো, ইতালী

 

নিয়মিত আপডেট পেতে “প্রবাস জীবন” ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন