• আজঃ সোমবার, ১৩ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

মাগুরায় এনজিওর ফাঁদে গ্রামের মহিলাদের শেষ সঞ্চয়।

গ্রাম ও শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ তিন দশক আগ থেকে এনজিও কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু বর্তমানে কিছু কিছু এনজিও তাদের বিতর্কিত কার্যক্রমের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের উন্নয়ন তো দূরের কথা ডিপিএস এর মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছে গ্রামের অনেক মহিলার জীবনের শেষ সঞ্চয় টুকু।

মাগুরা সদর উপজেলার জগদল গ্রামের “জগদল আল আমিন সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিঃ.” রেজিস্ট্রেশন নম্বর ০০২৬, দীর্ঘদিন ধরে মাগুরার বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রান্তিক মহিলাদের কাছ থেকে ডিপিএস এর মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছে লাখ লাখ টাকা। জগদল বাজার এর পাশে “সোনা ভবনে” কোন নাম ও সাইনবোর্ড ছাড়াই গোপনে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির মালিক নজরুল ইসলাম নান্নু। ‌

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় মাগুরার নিশ্চিন্তপুর এলাকার প্রায় কয়েক শ মহিলার কাছ থেকে বিভিন্ন মেয়াদে ও বিভিন্ন পরিমাণ টাকার মাসিক ডিপিএস সংগ্রহ করা হয়েছে, এর মধ্যে অনেকের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই তারপরও এই এনজিও কর্তৃপক্ষ গ্রাহককে কোনো টাকা-পয়সা দিচ্ছে না উপরন্ত বিভিন্ন ভয়-ভীতি ও আজকাল করিয়া কালক্ষেপণ করছে।

ভুক্তভোগীদের মধ্যে নিশ্চিন্তপুর গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক মোল্লার স্ত্রী ছবি (৫০) দীর্ঘ ১২ বছর ধরে দুইটা ডিপিএস এর অনুকূলে প্রতিমাসে ৫০০ টাকা করে‌ জমা দিতেন এই এনজিওতে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১০ বছর পরে তিনগুণ টাকা হওয়ার কথা, এখন এই এনজিওটি লাভ তো দূরের কথা আসল টাকাও দিচ্ছে না।

ছবি জানান ” আমি কখনো বাড়ীর মুরগী বিক্রি করে, কখনো ডিম বিক্রি করে কিংবা কখনো পরের ক্ষেতের মরিচ তুলে এই টাকা সঞ্চয় করে এনজিও তে জমা দিয়েছিলাম এককালীন কিছু লাভের আশায়, কিন্তু এখন বলছে আমরা কোন টাকা পাব না পারলে আদায় করে নাও।

ভুক্তভোগীদের আরেকজন একই গ্রামের আরিফ হোসেন এর স্ত্রী আসমা খাতুন (৪২) তিনি ২০০৭ সাল থেকে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা জমা দিয়ে একটি ডিপিএস চালিয়ে যাচ্ছেন, মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোন টাকা-পয়সা তো পাননি, উল্টো ভয়-ভীতি ও বিভিন্ন টালবাহানায় কালক্ষেপণ করছে এই এনজিওর মালিক নজরুল ইসলাম নান্নু। আসমা আরো জানান “এনজিও কোনো লাভ তো দেবেই না উল্টো আসলের অর্ধেক কেটে রাখবে”।

এদিকে নিশ্চিন্তপুর এলাকায় এই এনজিওর মাঠকর্মী আব্দুল বারী মোল্লার মেয়ে বেদেনা (৬৫) জানান আমি এই এনজিওতে মাঠকর্মী হিসেবে কাজ করতাম, আমার মাধ্যমে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ টি ডিপিএস করা হয়েছে, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১০ বছর মেয়াদী ডিপিএস করলে গ্রাহককে তিনগুণ টাকা দেয়ার কথা এবং আমার নিজেরও তিনটা ডিপিএস আছে কিন্তু এখন এনজিও টাকা প্রদানে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।

এনজিও কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ছলচাতুরীর আশ্রয় নিলেও গ্রাহকরা আমার বাড়িতে ভিড় জমাচ্ছে ও চাপ সৃষ্টি করছে, এই বৃদ্ধ বয়সে ভেবেছিলাম ডিপিএস করে শেষ জীবনে কিছুটা শান্তির মুখ দেখবো কিন্তু এখন উল্টো বিভিন্ন টেনশনে আমার ঘুম আসেনা। বেদনা আরো জানান এই অঞ্চলে প্রায় একশতরও বেশি গ্রাহক ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ টাকা এই এনজিওতে জমা দিয়েছেন, এখন কেউ কোনো টাকা-পয়সা পাচ্ছে না।

এদিকে জগদল আল আমিন সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় বাইরে কোন সাইনবোর্ড নাই, ভিতরে এনজিওর মালিক নিজেই বসে আছেন এবং গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করছেন। গ্রাহকের পাওনা টাকার কথা জিজ্ঞাসা করতে তিনি জানান, আমি আগের মালিকের কাছ থেকে এনজিও টা কিনে নিয়েছি, চেষ্টা করছি একটু একটু করে সবার ঋণ পরিশোধ করতে।

কেউ যদি মূল বই ও রশিদ জমা দিয়ে আমার কাছে টাকার জন্য আবেদন করে তাহলে আমি টাকা দিব। কিন্তু গ্রাহকরা মনে করেন মুল বই ও রশিদ জমা দিলে উনি আমাদের আর কোন টাকা পয়সা দিবেন না, এটা প্রমাণপত্র গায়েব করার একটা কৌশল মাত্র। ভুক্তভোগীরা সবাই প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।