• আজঃ বুধবার, ১৩ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৮শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

গল্পঃ যারা মাকে ভালবাসেন গল্পটি এড়িয়ে যাবেন না

যখন আমার দশ বছর বয়স, তখন মায়ের অন্য জায়গায় আবার বিয়ে হয়। এরপর থেকে বিশটা বছর মায়ের মুখটা একটি বারও দেখতে পাইনি!
মা এখন কোথায় আছে জানিনা। আমার পষাণ বাবা মায়ের সাথে তালাক হওয়ার পর,কোন ছবি বা স্মৃতি ঘরে রাখেনি। সব কিছু পুড়িয়ে দেন।আমার মায়ের স্মৃতি মানেই দাদির কাছে গল্প শুনা। ছোট বেলা দাদির কাছে মায়ের গল্প শুনতাম আর কান্না করতাম।
একদিন বাবা এসে বললেন, ‘কি রে শুভ কাঁদিস কেন?’
আমি তখন ছোট মানুষ সরল মুখে বলেছিলাম, ‘আম্মার কথা মনে পড়ছে তাই কাঁদছি।’
আমার বাবা রফিক সাহেব তখন নিজের ক্রোধ সামলাতে না পেরে দাদির সামনেই ঠাশ করে থাপ্পড় মারলেন।

দাদি খেপে ওঠলেন। বাবাকে বেশ কিছুক্ষণ শাসিয়ে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে ‘আদর করে বললেন, ‘ তোর বাবা যেদিন বাড়িতে থাকে সেদিন আর মায়ের গল্প শুনতে চাস না।” বাবা সা’থে মায়ের ডির্বোসের কি কারণ তা আমি জানতাম না।বড় হয়ে দাদির কাছ থেকে শুনেছি।
আমার বাবা ছিলেন রগচটা খিটখিটে মেজাজের।পান থেকে চুন খসলেই তিনি রেগে যেতেন।অকারণেই মায়ের সাথে ঝগড়া করতেন। মাকে দেখতাম চুপচাপ কান্না করত আর চোখের জল ফেলত।

আমার যখন ছয় বছর বয়স মা আমায় স্কুলে ভর্তি করি’য়ে দিলেন।আমি মায়ের আঁচ’ল ধরে টুকটুক করে স্কুলে যেতাম।
সকাল বেলা নিয়ে যেতেন, তিন ঘন্টা অপেক্ষা করে দুপুরবেলা নিয়ে আসতেন।
মা সব সময় আমার প্রতি যন্তশীল ছিলেন। আমার সব চাহিদা আবদার তিনিই পূরণ করতেন।
আমার স্পষ্ট মনে আছে একদিন স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখি বাবা মা’য়ের গায়ে হাত তুলে মারছেন। আমি পাগলের মত চিৎকার করে কান্না করছি। সে সময় দাদি বাড়িতে ছিল না। আমি দৌড়ে দাদিকে খুঁজতে বের হই।একটা সময় ফিরে এসে দেখি সারা বা’ড়ি নীরব। দাদি বারান্দায় চুপচাপ বসে আছেন। ঘরে গিয়ে দেখি মা কোথাও নেই।
দাদিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মা কোথায়?’
দাদি চোখ মুছে বললেন, ‘চলে গেছে।

আমি যখন খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেই। এক সময় চাচা আমাকে নানার বাড়ি রেখে আসেন।
নানার বাড়িতে পাঁচ মাস ছিলাম।সেই পাঁচ টা মাস আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের সময় ছিল। কিন্তু মা আমাকে প্রতিই রা’তেই কেন যেন বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদত।কেন কাঁদত তখন তা কিছুতে’ই বুঝতে পারতাম না।একটা সময় বাবা আ’মাকে নিতে আসেন। আমি মায়ের কমরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছি।বললাম, ‘না। আমি কিছুতেই যাব না।’
দেখি মা অঝরে কান্না করছেন।কিছুই ব’লছেন না।
নানা এসে বললেন, ‘শুভ আসো তোমার বাবা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে।’
আমি মাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম।
মামা আমার দিকে রেগে তেড়ে আসলেন।কিন্তু মা চোখ ইশারা দিতেই দুজন বের হয়ে যান।

মা আমার মাথায় অনেক’ক্ষণ হাত বুলিয়ে আদর করলেন।
আমি মাথা তুলতেই আমার চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘শুভ তুই বড় কি হবি?
আমি চোখ মুছতে মুছতে উত্তর দিলাম, ‘ডাক্তার হব।
মা একটা হাসি দিয়ে বললেন, ‘বাবা তুই ডাক্তার হতে পারবি কিনা জানিনা,দোয়া করি, যেন তোর বাবার মত অমানুষ না হস।
দেখি মা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠলেন। শুভ তোকে রাখার অধিকার আমার আর নেই। যেদিন বড় হবি ঠিকি বুঝতে পারবি।মা আমার কপালে একটা চুমু খেলেন। আস্তে আস্তে বললেন, ‘দোয়া করি তুই যেন মানুষের মত মানুষ হতে পারিস। এখন যা তোর বাবার সাথে বাড়ি ফিরে যা।

আমার বুকের ভিতরটা কান্নায় ভেঙে আসতে চাইলো। চিৎকার করে কেঁদে উঠতে চাইলাম,কিন্তু সে কান্না কোথায় যেন বাধা পেয়ে ফিরে গেল।
জীবনের প্রথম মায়ের প্রতি অভিমান হয়েছিল।মাথা নিচু করে বের হওয়ার সময়, মা আবার কাছে টেনে নিলেন। গালে লম্বা করে একটা চুমু দিলেন।
কিন্তু হায়… সেদিন বুঝতে পারিনি এটাই ছিল আমার মায়ের শেষ স্পর্শ!

দাদির কাছ থেকে শুনেছি, তালাকের ব্যাপারে মা বাবা দুজনেই নাকি সম্মতি ছিল। কিন্তু মায়ের শর্ত ছিল, আমি নাকি মা’র কাছেই থাকব। কিন্তু বাবা রাজি হলেন না। মা’ও জিদ ধরে বসলেন, ছেলে আমার কাছেই থাকবে।
সেই সমস্যার সমাধান নানা করলেন।মাকে বললেন, ‘না এই ছেলে আমি রাখব না। তোর ভবিষ্যৎ আছে। তাদের ছেলে ওরা নিয়ে যাক।
আমি আস্তে আস্তে বড় হতে থাকি। বাবা কে মায়ের কথা বলতেই, বাবা খেপে যেতেন।
মনের মধ্যে জিদ ছিল, একদিন কেউকে না জানিয়ে মাকে চুপিচুপি দেখে আসব।
আমি ক্লাস টেনে উঠলাম।দাদিকে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে নানার বাড়ি কিভাবে যেতে তার ঠিকানা নিলাম।

ট্রেন থেকে রেল ষ্টেশনে নামতেই মনে পড়ে গেল নানার বাড়িটা কোনদিকে। আমার মনে আছে আমি টানা দশ মিনিট পাগলের দৌড়াচ্ছিলাম।
উঠনে এসেই দেখি নানা দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে চিনতে পেরে জড়িয়ে ধরলেন। আমি আস্তে আস্তে মায়ের রুমটা তে ঢুকলাম, দেখি মায়ের রুমটা অগোছালো! বুজলাম,মা এখানে থাকেনা।
নানাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মা কোথায় গেছে?
আমার বৃদ্ধ নানা কাঁদছেন।চোখের পানিতে দাড়ি ভিজে গেছে।
‘নানা আল্লাহর কসম লাগে। বল, মা কোথায়?
‘তোর বাবা কিছু বলে নাই?’
‘না। কেন কি হয়েছে?’

তোর বাবার সাথে তালাক হওয়ার পর ওকে আমরা আবার বিয়ে দিয়েছি। এখন সেখানেই আছে। বিয়ের পর মেয়েটা একটা বারও এখানে আসেনি।নানার কথা গুলো শুনার পর আমার চারপাশ ঘুরছিল। মায়ের বিয়ে হয়ে গেছে,অথচ কেউ আমায় জানায়নি।
নানার কাছে মায়ের নতুন শ্বশুর বাড়ির ঠিকানা জানতে চেয়েছিলাম। নানা বলল, ‘ তোর মায়ের নিষেধ আছে।বলেছে তুই একসময় আসতে পারিস।তুই যতই পাগলামি করিস না কেন, ঠিকানা না বলতে।আমি তখন কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে যাই। নানা পিছন থেকে ডাকেন, ‘শুভ খালি মুখে যাস না, কিছু খেয়ে যা।

এইচ.এস.সি’র পর মেডিকেলে চান্স পেলাম। দাদি বাবা দুজনেই খুশি হলেন। বাবার খুশির মাত্রা ছিল অনেক বেশি।এই বদমেজাজি মানুষটা সারা এলাকাজুড়ে নিজ হাতে মিষ্টি বিতরণ করলেন।
আমার মনে হচ্ছিল ইশ! মা যদি থাকতো। এমবিবিএস পাশ করে ইন্টার্নশিপ
করার সময় থেকেই বয়স্ক মহিলাদের আমি মা বলে সম্বোধন করতাম। মফস্বল শহরের সেই হসপিটালের রোগীরা আমারা মুখে মা ডাক শুনে অবাক হত।

একটা ঘটনা না বললেই নয়। একবার এক মূমুর্ষ রোগী হাসপাতালে এসে ভর্তি হয়। অবস্থা এতই সিরিয়াস ছিল যে সারারাত পাশে থাকতে হয়েছিল।সেই মহিলা সুস্থ হয়ে আমাকে বলল, ‘বাবা তুমি এত সুন্দর করে মা-মা ডাকো, আমায় রাতদিন খেটে সেবা যন্ত করে সুস্থ করলে। আমার খুব জানতে ইচ্ছা হয়, তোমার আপন মা না-জানি তোমার এত সেবা যন্ত ভালোবাসার অত্যাচার কিভাবে সহ্য করে…।
ব্রোকেন ফ্যামিলি তে একজন সন্তানের কি পরিমাণ জ্বালা-যন্ত্রণা কষ্ট তা বাইরের থেকে মানুষ খুব একটা উপলব্ধি করতে পারেনা।
বাবা-মা তালাক হয়ে যাওয়ার পর এই বিশটা বছরে তিলে-তিলে কত কষ্ট সহ্য করে বড় হয়েছি,তা শুধু আমিই জানি।

এখন আমার বয়স ত্রিশ। বাবা ষাট বছরের বৃদ্ধ। বাবা আর বিয়েও করেননি।ছুটিতে যখন বাড়িতে যেতাম, মাঝরাতে বাবার রুম থেকে চাপা কান্নার আওয়াজ শুনতে পেতাম। সমীকরণ মিলাতে চেষ্টা করতাম, বাবা কি জন্যে কাঁদেন? মায়ের সাথে খারাপ আচরণের অনুসূচনার জন্য? নাকি দাদির পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার কষ্টে।
আমি যে আজ এ পর্যন্ত আসতে পেরেছি, আমার কাছে মনে হয় সবটা মায়ের দোয়াতেই।
মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত। কিন্তু, আমি এই অভাগার জ্ঞান হওয়ার পর থেকে, মায়ের চরণতলের ধূলোটুকুও কপালে স্পর্শ করার সুযোগ হয়নি। তাই সব সময় শয়নেস্বপনে প্রার্থনায় একটাই ছিল, মা’র মুখটা যেন আবার দেখতে পাই।

ঘুম থেকে ওঠে দেখি সকাল নয়টা ত্রিশ বাজে।তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে উঠালাম। সকাল দশটায় মেডিকেলে রোগী ভিজিট করতে হবে।দুপুর ১২টা। মেডিকেলের ক্যান্টিনে বসে চা খাচ্ছি।হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে।দেখি আমার কলিগ ডা.সিফাত ফোন দিয়েছে। রিসিভ করতেই, হ্যালো।
ভাই কোথায় আছেন?
ক্যান্টিনে। কেন?
ভাই, আমি মাত্রই হসপিটাল থেকে জরুরী কাজে বাইরে এসেছি। নার্স কল দিয়েছিল। ওয়ার্ড B এর এক পেশেন্টের অবস্থা নাকি সিরিয়াস। আপনি ওখানে একটু যদি যেতেন।
আচ্ছা,যাচ্ছি।

ওয়ার্ড B, ৫২৮ নাম্বার কেবিন রুম । পেশেন্টের দিকে তাকিয়েই আমি চমকে যাই।
আমার মা শুয়ে আছেন। চোখ দুটো বন্ধ। দ্রুত মায়ের কাছে গেলাম। চেক করে দেখলাম, হৃদস্পন্দন অনিয়মিত, অনেকক্ষণ থেমে থেমে হচ্ছে। বুঝলাম মায়ের অবস্থা খুব খারাপ।
পাগলের মত চিৎকার করে নার্স আর ওয়ার্ড বয়কে ডাকলাম। বললাম, ‘মাকে দ্রুত আইসিইউ তে নিতে হবে।’
টলিতে করে মাকে আইসিইউ তে নিয়ে যাচ্ছি। চোখের জলে আল্লাহর কাছে আরজি জানালাম, এত কাছে পেয়ে মাকে হারাতে চাইনা। মাকে যেন সুস্থ শরীরে আইসিইউ থেকে বের করে নিয়ে আসতে পারি।

পরিশিষ্ট :
দুইদিন পর মায়ের জ্ঞান ফিরে।জ্ঞান ফেরার আগ পর্যন্ত সারাক্ষণ মায়ের পাশেই ছিলাম। মায়ের সাথে থাকা লোকজন আমায় বলল, ‘বাবা আপনার কাছে অনেক কৃতজ্ঞ।আপনি না থাকলে ওকে হয়তো বাঁচানো যেত না।

মায়ের জ্ঞান ফিরে বিপদমুক্ত হওয়ার পর থেকে আমি মায়ের সামনে আর আসিনি।চুপিচুপি মাকে দেখে চলে যাই। মা আমাকে দেখলেই হয়তো অনেক বেশি ইমোশনাল হয়ে যাবে। আর সেটা মায়ের শরীরে এফেক্ট পরে অবস্থা হয়তো খারাপের দিকে যেতে পারে।
তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, পরিপূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত মায়ের সামনে যাব না।

৭ দিন পর ডা.সিফাত এসে বলল, ‘ভাই।আপনি আপনার মায়ের কাছে যেতে পারেন।আজ উনাকে ছুটি দেয়া হবে।’ আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছি।ওয়ার্ড B, ৫২৮ নাম্বার কেবিন । ভিতরে ঢুকেই দেখি, মা উল্টোদিক ফিরে এক অল্প বয়সী মেয়ের সাথে গল্প করছে। মেয়েটা মায়ের একমাত্র মেয়ে। আমার বোন। আমার শরীরে মায়ের যে রক্তটুকু বইছে,মেয়েটার শরীরে মায়ের সেই একই রক্ত বইছে।

আমি মায়ের সামনে এসে দাঁড়ালাম। মা আমাকে দেখে চমকে উঠেন।অবাক বিস্ময়ে মায়াময় চোখে তাকিয়ে আছেন। বড় সুন্দর সে চোখ দুটো।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে মা’কে জড়িয়ে ধরলাম।
‘শুভ আমার ছেলে…’ এই বলে মা হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন।
আমিও কাঁদছি। কান্নাতেও যে এত মধুর আনন্দ তৃপ্তি আছে আগে বুঝতে পারিনি।