• আজঃ মঙ্গলবার, ৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

মিসকীন ও রাস্তার মানুষের প্রতি আমাদের দায়িত্ব

মিসকীন দুইটি আরবি শব্দের সমন্বয়। মাসাকা ও সাকানা। এই দুইটি শব্দ মিলে মিসকীন শব্দটি হয়েছে যার অর্থ কোন মানুষ যে কোন একটা পরিস্থিতির শিকার । মিসকীন মানে গরীব লোক না। এর জন্য আরবীতে অন্য শব্দ আছে। ফুকারা বলে একটি শব্দ আরবীতে আছে। কিন্তু মিসকীনের বিষয়টি আরেকটু গভীর।

মিসকীন তারাই যারা আর্থিক সমস্যা বা রাজনৈতিক সমস্যা বা অন্য যে কোন সমস্যা থেকে বের হতে পারছে না। যেমনঃ কেউ যদি ট্যাক্সি চালক হয়, সে ট্যাক্সি চালিয়ে তার পরিবারের জন্য উপার্জন করে কিন্তু হঠাৎ তার চোখে সমস্যা হলো যার ফলে তাকে সার্জারী করতে হবে এখন সে প্রায় দেখতেই পায় না তাই সে ট্যাক্সি চালাতে পারছে না। এটা তার একমাত্র উপার্জনের উপায় কিন্তু সে তা পারছে না। তার এখন করার মত কিছুই নেই, এটাই তার একমাত্র উপায় ছিলো যা দিয়ে সে উপার্জন করতো কিন্তু সে তো ভিক্ষুক না। সে অভাবীও না কিন্তু সে একটা পরিস্থিতির শিকার।

উদাহরণ হিসেবে সেই সব লোকের কথা বলা যায় যারা অবসর নিয়েছেন কিন্তু তাদের অবসরকালীন সঞ্চয় তাদের জন্য যথেষ্ট না। তাদের কেটাকাটা করার সামর্থ্য নেই এখন, তারা পরিস্থিতির শিকার। তাদের এখন এমন বয়সও নেই যে সে গিয়ে অন্য একটা কাজ করবে, তাদের স্বাস্থ্য ততটা ভালো নেই ফলে তাদের জীবন বেশ কঠিন ভাবে যাচ্ছে। এরকম অনেক মা আছে যারা তাদের পিতৃহীন সন্তানদের একাই লালন করছে কারণ তাদের ডে-কেয়ারে দেয়ার মত সামর্থ্য নেই। আর সন্তান লালন-পালনে ব্যস্ত থাকায় তারা কোন চাকরিও করতে পারছে না। তারা চাকরি করতে গেলে তাদের বাচ্চাদের দেখার মত কেউ থাকবে না। তাদের অনেকেরই কোন পরিবার বা এমন কেউ নেই যে বাচ্চাদের দেখাশোনা করবে। এই সকল লোকেদেরই মিসকীন বলা হয়, যারা বিভিন্ন কারণে পরিস্থিতির শিকার।

তারা নিজেদের সাহায্য করতে পারছে না, সকল দিক দিয়েই তারা আটকে গেছে। তারা জানে না তাদের কি করতে হবে। আল্লাহ বলেছেন এই সব লোকদের সাহায্য করতে। কিন্তু এসবের আগে, আমাদের প্রথমে দেখতে হবে আমাদের পরিবারের মধ্যে এমন কেউ আছে কিনা এরপর খোঁজ করতে হবে আমাদের সমাজে কারা এমন পরিস্থিতির শিকার।

কিন্তু সমস্যা হলো “এদের খোঁজ কিভাবে পাওয়া যাবে?”

আমি কিভাবে জানবো আমি যেই শহরে থাকি বা আমার এলাকায় এরকম কিছু পরিবার আছে যারা এই সমস্যায় পতিত। আমরা কিভাবে জানবো যদিনা আমরা একে অপরকে চিনি বা সেই পরিবারগুলোকে না চিনি?

আমরা শুধু জুম্মার পরে দেখা হলে সালাম দিয়ে চলে আসি কিন্তু আমাদের উচিত সবার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, পরিবারগুলোর মধ্যে বন্ধন তৈরি প্রয়োজন। এভাবেই আসলে সমাজ তৈরি হয় এবং কারো কোন সমস্যা হলে তার ভিক্ষা করার প্রয়োজন হয় না। তাদের মসজিদের বাইরে হাত পাতা লাগবে না কারণ আমরা সে সম্পর্কে অবগত।

কেউ চাকরি হারিয়েছি বা কারো চিকিৎসা প্রয়োজন বা কারো ঔষধ কিনতে টাকা দরকার সে সম্পর্কে আমরা জানি ও ব্যক্তিগতভাবে আমরা তাদের সাহায্য করতে পারি। এটাই তো সমাজের ধারণা তাই না? এই কাজগুলোই আমাদের করা উচিত।
আমাদের বুঝতে হবে “তাহাব্বু” মানে কি, রাসূল সা. বলেন, “তোমরা একে অন্যকে ভালো না বাসলে তোমাদের ঈমাণ পূর্ণ হবে না।” এই হাদীসের “আফশাও সালাম” অর্থ সালাম-এর প্রচার করা। কিন্তু সালামের প্রচার কেন করবো? এর মানে এই না যে শুধু কাউকে সালাম দিলাম আর সেখান থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসলাম। এটা সালাম না। সালাম বলতে এখানে নিজেদেরকে জানা বুঝানো হয়েছে। আর এভাবেই আপনি বুঝতে পারবেন মিসকীন কারা।

এরপর আসে ওয়া ইবনে সাবিল, আরবি থেকে যার আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় পথের সন্তান। এখানে সন্তান বলতে এমন কাউকে বুঝানো হয়েছে যে কোন কিছুর সাথে সম্পর্কিত। এমন কেউ যে একটানা ভ্রমণের উপর আছে এবং এক জায়গায় বেশিদিন অবস্থান করতে পারছে না, যেমনটা আগের সমাজে ছিলো, বেদুইনরা ভ্রমণের উপরই থাকতো এবং এক স্থানে বেশিদিন অবস্থান করতো না। একধরণের ভ্রমণকারী আছে যারা মুসাফির যারা শহরে বা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায়, আরেক প্রকার হলো ওয়া ইবনে সাবিল যাদের স্থায়ী ঠিকানা নেই, তারা কখনো মোটেলে, কারো বাড়িতে বা যেখানে সুযোগ পায় অবস্থান করে। তারা হয়তো এমন কোন ভয়ানক পরিস্থিতির শিকার যে তারা এক জায়গায় বেশিদিন থাকতে পারছে না। তাদের নিজের কোন বাড়ি নেই। এই ধরণের লোকদের খুঁজে বের করতে হবে ও সুযোগ থাকলে সাহায্য করতে হবে।

ধরেন আপনার কোন আত্মীয় ক্যালিফোর্নিয়া বা নর্থ ক্যারোলিনা বা অন্য কোথাও থাকে, সে আপনাকে জানালো যে তারা কিছুটা সমস্যায় আছে, তাদের সন্তানেরা কয়েক সপ্তাহের জন্য আপনার সাথে থাকতে পারবে কিনা। কিন্তু এটা আপনার জন্য ঝামেলা কারণ আপনার নিজের পরিবার ও নিজের কাজ আছে কিন্তু তারা বলছে তারা কয়েক সপ্তাহের জন্য আসতে পারবে কিনা।

আমাদের বুঝতে হবে যে এটা তাদের অধিকার। আপনার কোন আত্মীয় যখন বিপদে পড়েছে তখন আপনি যেই বাড়িতে থাকছেন সেটা সম্পূর্ণ আপনার বাড়ি না। এর একটা অংশ তখন তাদের, এমনটাই আল্লাহ বলেছেন। এটা তাদের অধিকার, আমাদের এটা দিতে হবে। আপনার এটা বলা উচিত হবে না, “এখন তো আমি ব্যস্ত, আমরা পারবো কিনা নিশ্চিত না। আমি আপনাকে এই এলাকার কিছু হোটেলের নাম্বার দিচ্ছি আপনি গুগোল থেকেও সেগুলো দেখতে পারেন।” এটা ঠিক না, আমাদের দান করার মানসিকতা থাকতে হবে।

-উস্তাদ নোমান আলী খান

নিয়মিত আপডেট পেতে “প্রবাস জীবন” ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন